Friday, August 7, 2015

বিশেষ অতিথি

প্রোবাবলি ২০০৩ এ, শহীদুল্লাহ হল ‘বাঁধন’-এর এক অনুষ্ঠানে হুমায়ূন আহমেদ এসেছিলেন বিশেষ অতিথি হয়ে।
প্রধান অতিথি ছিলেন ভাইস চ্যানসেলর ড. এস এম এ ফায়েজ। ইনফ্যাক্ট, অতিথিদের অর্ডার মনে নাই। তো, ঐ বাঁধন ইউনিটের সেরা রক্তদাতা প্লাস সংগঠকদের ক্রেস্ট ও পুরষ্কার দেয়া শেষ করে যখন একে একে অনুষ্ঠানের আলোচনা ইত্যাদি শুরু হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ তখন হঠাৎ উপস্থাপককে ইশারায় বললেন, আমি একটু আর্লি বলতে চাচ্ছি,
অন্যদের বক্তব্যের আগেই। এতে এতক্ষণের সভা একটু হোঁচট খেল। বিশেষ অতিথি তো পরে বলবেন। আসর জমে উঠলে। তার উপর হুমায়ূন আহমেদ, বস মানুষ! সবাই শুনতে আগ্রহী। যা হোক সিরিয়াল ব্রেক করে হুমায়ূন আহমেদের ফ্লোর আসল। নুহাশ (সম্ভবত) এবং শীলা আহমেদও ছিলেন অডিয়েন্সে, সামনের সারিতেই।
কিন্তু এই তাড়াহুড়ায় তিনি যা বললেন তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। যাকে বলে একেবারে ফ্ল্যাবারগাস্টেড হয়ে যাওয়া।

হুমায়ূন বলা শুরু করলেন যে, তিনি অনেকদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। পরে অ্যামেরিকা থেকে পিএইচডি’ও করে এসেছেন। এবং তারও পরে অনেক দিন হল। অনেক বছর গেল। এখন কেমিস্ট্রির নামজাদা শিক্ষক তিনি, প্লাস জনপ্রিয় লেখক। তার কিছু পেপারও পাবলিশড হল। কিন্তু তবুও তিনি প্রফেসর আর হন না। মানে উপরের র‍্যাঙ্কে আর যেতে পারেন না। প্রমোশান আটকে থাকে। কী করার? মেজাজ খারাপ তার। এই অবস্থায় কেউ একজন রাস্তা বাতলে দিলেন। তখন প্রথম বিএনপি সরকার ক্ষমতায়।
হুমায়ূন বলতে থাকেন। তখনকার জাঁদরেল শিক্ষক নেতা ছিলেন ফায়েজ স্যার। তো আমি ঘটনা বুঝে কিছুদিন ফায়েজ স্যারের পিছনে ঘুরলাম। ব্যস। কাজ হয়ে গেল। এর কিছু পরই লিস্টে আমার নাম উঠল এবং আমি ঝটপট ‘প্রফেসর’ হয়ে গেলাম।

অনুষ্ঠানে সেদিন অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। বড়সড় এক আয়োজনই ছিল সেটা। ইউসুফ হায়দার স্যার ছিলেন কি? মনে হয়। ছাত্রদলের সিনিয়র নেতারাও অনেকেই ছিলেন।
তো ঘটনার পর আমাদের সবার এক চোখ আইনস্টাইনের মত গোঁফ-চেহারার ফায়েজ স্যারের দিকে, অন্য চোখ বক্তা হুমায়ূনের দিকে।
এর মাঝেই কিছু কথা বলে হঠাৎ ফায়েজ স্যারকে উদ্দেশ্য করে হুমায়ূন আহমেদ বলে উঠলেন, স্যার, স্বাধীনতার অনেকদিন পার হয়েছে। দেশে এখন এই ধরনের শিক্ষক রাজনীতির তো আর প্রয়োজন নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের আলাদা রাজনীতি প্লিজ আপনি উদ্যোগ নিয়ে বন্ধ করে দিন! এইভাবে পিছনে পিছনে ঘুরাঘুরি করে প্রফেসর হতে হবে কেন? (কথাটা আজও, এই ২০১৫ তেও কি প্রযোজ্য? হু নোওজ!)
বলেই মাইক্রোফোন রেখে তিনি বেরিয়ে গেলেন। একদম সীমানার বাইরে। পুরা রুম চুপ। কী হোল এটা!
এনিওয়ে, ফায়েজ স্যার স্মার্ট পিপল। অলওয়েজ। তিনি হুমায়ূন আহমেদ যেতে না যেতেই মাইক নিয়ে এক মুহূর্তেই কিছু বললেন তাঁকে উদ্দেশ্য করে। সেটাও ভাল ছিল। পুরাটা থাক, শেষ লাইনটা ছিল অনেকটা এমন, “এই যে হুমায়ূন আহমেদ সরাসরি সমালোচনা করলেন, এরকম মুক্ত রাজনীতি টিকে থাকুক।”

হুমায়ূন আহমেদ যখন চলে যাচ্ছেন আমরা জুনিয়র স্টুডেন্ট যারা ফার্স্ট ইয়ারে বা সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি গেলাম পিছন পিছন। ঘুরঘুর। কারণ, এখনই তো মজা। আজকে যা হবে না!
আমাদের আগে আগে শীলা আর নুহাশও তখন বের হয়ে টিভি রুমের দোতলা থেকে নিচে নিমে গেলেন, উঠলেন কালো একটা গাড়িতে।
সিঁড়িতে হঠাৎ স্যারকে থামালেন কেমিস্ট্রির এক ইয়াং টিচার। তিনি খুব বিনীতভাবেই জানালেন, স্যার আমি ডিপার্টমেনটের লেকচারার হয়েছি গত বছর।
হুমায়ূন স্ট্রেইট জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমার রেজাল্ট কী হয়েছে?’
—স্যার, আমি সেকেন্ড হয়েছি।
আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘যে ফার্স্ট হোল সে কই?’
—স্যার, সে তো বিদেশে চলে গেছে।
এই শুনে হুমায়ূন বললেন, হ্যাঁ, এইই তো হবে! তোমরা সব টিচার হবা, আর ফার্স্টগুলা বিদেশে চলে যাবে!
আমরা এইবার ডাবল মাস্তি নিয়ে নিচে নেমে হুমায়ূন আহমেদকে বিদায় দিলাম, অনেকটা হৈ হুল্লোড় করতে করতেই। তিনি শহীদুল্লাহ হলের এক্স হাউজ টিউটর। সবাই তাঁকে চেনে।
তাঁর বক্তৃতায় সেদিন এও বলেছিলেন যে, এরপরও কিছুদিন তিনি ঢাবিতে ছিলেন। বড় মেয়ে নোভা কম্পিউটার সাইন্স-এ ভর্তি হওয়ার পর তিনি অধ্যাপনার চাকরিটা ছেড়ে দেন। এসব কিছুই তিনি একনাগাড়ে অল্প কতক্ষণের ভিতরই বলে গিয়েছিলেন। যেন বন্ধুদের আড্ডায় বলছেন। শান্ত, কেমন শীতল একটা টোনে।

হাউ-এভার। সেই যুগে, সকল রথী মহারথীদের সামনেই তিনি ‘ঐ কথা’ বলতে পেরেছিলেন। জ্বী, পেরেছিলেন! হুমায়ূন অন্য কোথাও বলেছিলেন, ‘না’ বলতে শিখতে হয়। ঠিক। ঐ ‘না’ বলার এবং সেদিনের সেই ‘সাহস’ তাঁর ছিলই।

লেখকঃ শাহরিয়ার সাব্বির তানবীর

থমকে যাওয়া অস্টম পে স্কেল: কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর

ফিদা হাসান

সংবাদপত্রে মাধ্যমে জানতে পারলাম বহুল প্রতিক্ষিত সরকারী চাকুরীজীবিদের বেতন স্কেল (অস্টম পে স্কেল)-এর আলোর মুখ দেখতে আরো কিছু দিন সময় লাগবে। কারন হিসাবে অর্থ মন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, স্কেলকে আরো পর্যবেক্ষন করতে হবে। প্রস্তাবিত স্কেলে ‘টাইম স্কেল’ এবং ‘সিলেকশন গ্রেড’ না থাকাতে কিছু গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষতির সম্মুখিন হবে একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষকেরা মানব বন্ধন সহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু কি কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ক্ষতিগ্রস্থ হবে সেটা খতিয়ে দেখাটাই হবে বিচক্ষনতা। দেখা যায় সপ্তম বেতন স্কেলে সচিব, সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল পদের ব্যক্তিদের ‘এক নম্বর’ গ্রেডে রাখা হলেও প্রস্তাবিত অস্টম গ্রেড স্কেলে সিলেকশন গ্রেড না থাকায় সিনিয়র অধ্যাপকদের সেই গ্রেড প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকছে না। একই সাথে ‘গ্রেড এক’ এ সচিবদের রেখে কমিটি তার উপরে আরো দুটি অদৃশ্যমান গ্রেড তৈরি করেছে, যার একটিতে আছে মুখ্যপরিষদ সচিব/মুখ্য সচিব, পরেরটিতে আছে সিনিয়র সচিব। বিষয়টা এখন দাড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক জুনিয়র সচিবের ক্যাটাগরিতে থাকছে একই সাথে অধ্যাপকের অবস্থান আরো অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে।

সমস্যাটি কেনো ঘটেছে তা কিছু ঘটনা পরম্পরা বিশ্লেষন করলে বোঝা যাবে। ২০০৭-এ আর্মি যখন কেয়ারটেকার গভর্মেন্টের সাথে দেশের ক্ষমতায় আসলো, তৎকালীন আর্মি চিফ, লেফট্যানেন্ট জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ তার পদবী আপগ্রেড করলেন, তিনি জেনারেল হলেন। একই সাথে আর্মির নিজেস্ব ব্যাংকের কার্যক্রম প্রশস্ত হলো , বিশ্ববিদ্যালয় হলো, সুযোগ সুবিধা আরো বাড়লো। বর্তমান সরকারের গত টার্মের শেষের দিকে যখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নাজুক, বাংলাদেশ পুলিশ তাদের র‍্যাঙ্ক বাড়ালো, দ্বিতীয় শ্রেনীর থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) হলেন প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা। এখন তারা নিজেস্ব বিশ্ববিদ্যালয় দাবী করেছে। আবাসন ব্যবস্থা সহ আরো অনেক সুযোগ সুবিধা প্রকৃয়াধীন রয়েছে। এবার প্রশাষন (এডমিন ক্যাডার) এর দিকে তাকানো যাক, এই অস্টম পে স্কেল-র প্রথমদিকে অসমাঞ্জস্য মুলত তারাই তৈরি করেছে। তারা সুযোগ সুবিধা বাড়াতে বাড়াতে তাদের প্রথম দুটি গ্রেড, গ্রেড-১ থেকেও উপরে উঠিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি এই প্রফেশনে যারা চাকুরি করে , অপরাধ করার পরেও পুলিশ অনুমতি ছাড়া তাদের গ্রেফতার করতে পারবে না এমন ধারার আইন করে নিচ্ছে। বিচারপতিরাও পিছিয়ে নেই, সম্প্রতি এক রিপোর্ট থেকে জানতে পারি তারা তাদের ডিস্ট্রিক জজকে সচিবের পদমর্যাদায় এনে একটা ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স করে কার্যালয়ে চিঠি চালাচালি শুরু করেছে, যে বিষয়টা নিয়ে মহান জাতীয় সংসদেও কথা হয়েছে।

এখন যদি প্রফেশন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একই ধারায় বিশ্লেষন করি তাহলে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অধ্যাপক ইয়াজুদ্দিন আহমেদ দীর্ঘমেয়াদে (২০০২-২০০৭)বাংলাদেশের মহামান্য রাস্ট্রপতি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য কিছু করেছে? ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য তার ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছু করেছে বলে কোন রেকর্ড নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেস্টা হিসেবে এই কিছু দিন আগেও বেশ কয়েকজন শিক্ষক/প্রাক্তন শিক্ষক ছিলেন, তারা কি শিক্ষকদের জন্য কিছু করেছেন? তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা তা করেন নি। প্রফেসর মহাব্বত খান, সাবেক পি এস সি র সদস্য এবং বর্তমান ইউ জি সি-র সদস্য , সম্প্রতি এক পত্রিকার কলামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের উপর বিষাদগার করেছে। যদিও তিনি নিজেই শিক্ষক। শুধু ইউ জি সি কিংবা পি এস সি নয় অন্যন্য প্রতিষ্টানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গুরুত্বপুর্ন দায়িত্বে থাকে। কিন্তু, রেকর্ড সেই এক। এই কমিউনিটির জন্য তারা আলাদা করে কিছু করে না, কারন সেটা তাদের দায়িত্ব নয়, নৈতিকতার সাথেও সেটা যায় না। অধিকন্তু সাবেক ব্যাঙ্ক গভর্নর জনাব ড. ফরাস উদ্দিন যিনি এই অস্টম পে স্কেল কমিশনের প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেছেন ১৮ বছর, সেই প্রাক্তন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সহ ওই কমিশনে থাকা আরো কয়েকজন শিক্ষক সুযোগ পেয়েই শিক্ষকদের বেতন আর মর্যাদায় হাত দিয়েছেন। কিন্তু কেন দিলেন এটা সরকারসহ সবাইকে ভাবতে হবে। বিগত কয়েকদিন আমি বেশ কিছু সিনিয়র শিক্ষকদের সাথে কথা বলে তাদের অভিমত জানতে পারলাম। তাদের মতামত, বেতন কাঠামো নিয়ে যে অবমাননা হচ্ছে তা কাম্য নয় কিন্তু একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বিগত সময় ধরে যা ঘটে চলেছে তাও কোনভাবেই কাম্য নয়। বেশ কিছু সিনিয়র শিক্ষকদের মতমতটা এতটাই স্ট্রং যে তারা তাদের বেতন অবনমন থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এই ধারাতেই যে বেতন কমিশনের শিক্ষক সদস্যরা শিক্ষকদের বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অনুমান করা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দৃষ্টিকোন থেকে কমিশনের সচিবেরা তাদের নিজেদের বিচার করতে পারে নি। বরং তারা সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে। এবার যদি মোরাল দৃষ্টিকোন থেকে কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে অন্য সব প্রথম গ্রেডকে পর্যালোচনা করেন তাহলে দেখতে পাবেন, কন্সটিটিউশনকে ভায়োলেট করে আর্মি যখন ক্ষমতা নেয়, তারা কি রিগ্রেট করে? এমন কোন নজির নেই যেখানে তাদের মনোবেদনা প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশের অহরহ ঘুস কেলেঙ্কারী কিংবা অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি অথবা তাদের অফিসে যখন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন কি তারা মনো যাতনায় ভোগে? সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির সমতানে কোন অনুতাপের নজির আমরা দেখতে পাই না। একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন সচিবের ঘুস কেলেঙ্কারী ফাস করতে আত্মহুতি দেয় তখন কি তাদের মনো পীড়ন শুরু হয়, কিংবা একজন শিক্ষককে যখন তাদের পায়ে হাত দিতে বাধ্য করে, তখন? এখন পর্যন্ত কোন নজির দেখা যায় নি। বিচার বিভাগ নিয়ে কথা না বলি। দেশের এনার্কির ভিতরে তারা আদালত অবমাননা নামক এক হাইলি সিকিউর্ড প্লেস তৈরি করে রেখেছে, হয়ত বা সেটা তাদের জন্য ভালো এবং দেশেরও জন্য দরকার! এই বিষয়ে মন্তব্য তাই নিস্প্রয়োজন।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকুল শিক্ষার পরিবেশ না থাকা্র মনো বেদনা কিন্ত এই শিক্ষকদের ই আছে। সত্যিকারের অর্থেই তারা তাদের ছাত্রছাত্রীদের উন্নতি জন্য ভাবিত হয় এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, ঠিক যেমনটা পিতামাতা তাদের সন্তানের জন্য ভাবিত হয়। এই শিক্ষকেরা দেশের জন্যও ভাবিত হয় কেননা এখানেই তাদের সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীরা বসবাস করবে। তাই তারা এই স্কেল অবমাননার পরেও দ্বিধান্বিত, স্কেল ফিরে পাবার বেশি তারা কিছু চায় না। তারা অন্যদের মত দেশটা কে শুধু ভোগ করে যাচ্ছে না। বরং তারাও চাচ্ছে পরিবেশ পরিবর্তিত হোক, শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসুক। সত্যি বলতে কি, বিগত এক দশক ধরে সুপরিকল্পিত ভাবে গুটি কয়েক আনফিট এই প্রফেশনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা শিক্ষক নয় শুধুই মাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যারা বিভিন্ন ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রুটি পুর্ন নিয়োগ প্রকৃয়ার পরিবর্তন এনে তাই যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক, এখন সকলের দাবী। একই সাথে গবেষনার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হোক। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শুধু ক্লাসরুম একটিভিটিজের মোহে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি বরং শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি গবেষনা করার মোহেই এসেছিলো। মোহ যখন ভেঙ্গে যায়, বিভ্রান্ত হয়ে বিপথগামী হতে তখন বেগ পেতে হয় না। ঘটনা পরম্পরার এই দায়ভার তাই রাস্ট্র এড়াতে পারে না, রাস্ট্রকে অবশ্যই এই দায়ভার নিতে হবে, রাস্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অংশের ভিতরে সরকারকে আন্তরিক সমন্বয় ঘটাতে হবে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সমাধানে আশু পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। কেননা সময় এখনো শেষ হয়ে যায় নি।

লেখক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ব্রিসবেন অস্ট্রেলিয়া থেকে
Email: k.fidahasan@yahoo.com

Are they journal or waste paper?


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা জার্নাল বের হয় যার নাম Dhaka University Journal of Science। অনেক দিন ধরে বুঝতে চেষ্টা করেছি এই জার্নালের উদ্দ্যেশ্য কি? শুধু কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়? বাংলাদেশের অনেকগুলো পাবলিক এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েরও তাদের বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক জার্নাল আছে। এই জার্নালগুলোর author কারা? আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো reviewer কারা, এডিটরিয়াল বোর্ডে কারা। যারা reviewer বা এডিটরিয়াল বোর্ডে আছেন তাদের নিজেদের রিসার্চ পাবলিকেশনের কি অবস্থা। আমি নিশ্চিত জানি অধুনা Dhaka University Journal of Science-এর একজন এডিটর ছিলেন যিনি গত ২৫-৩০ বছরে কোন রিসার্চ পেপার আন্তর্জাতিক এমনকি দেশীয় জার্নালে পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তিনি কোন পিএইচডি এমনকি এমএস ছাত্র পর্যন্ত supervise করেননি। এছাড়া অন্যরা যারা ছিলেন তারাও যে বলার মত বা উল্লেখযোগ্য কিছু করেছেন এমন না। হবে কিভাবে? পঞ্চাশের অধিক আন্তর্জাতিক জার্নালে পাবলিকেশন আছে এরকম শিক্ষক আমার জানা মতে আমাদের হাতে গুনা দুয়েকজন আছেন। একটা জার্নালের এডিটরের কি পরিমান রিসার্চ পেপার থাকা উচিত সেটা কম বেশি আমরা অনেকেই জানি। তাদের সাথে আমাদের মিলালে পার্থক্যটা স্পস্ট হবে। যাদের রিসার্চ-এর সাথে কোন যোগাযোগ নেই তারাই editorial বোর্ডে, তারা হয় reviewer। কি বিচিত্র আমার সোনার বাংলা!! লজ্জাও লাগে না? 

এমন পরীক্ষা যদি থাকে যেখানে পরীক্ষা দিলেই পাশ সেটাকে যেমন আর যাই হউক পরীক্ষা বলা যায় না তেমনি এমন জার্নাল যদি থাকে যেখানে submit করলেই accepted সেটাকে আর যাই হোক জার্নাল বলা যাবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে নামী দামী সাইন্টিফিক জার্নাল হলো Nature, Science। এসব জার্নালে submit করলে editorial ডেস্ক থেকেই ৯০%-এর অধিক submitted পেপার ফেরত দেওয়া হয়। বাকিদের reviewer-এর কাছে পাঠায় এবং ওখান থেকে খুবই কম percentage অফ পেপার finally প্রকাশিত হয়। আর আমাদের Dhaka University Journal of Science-এ কি ঘটে? এখানে কারো যদি প্রমসন দরকার হয় এবং আরো দুই-তিনটা পাবলিকেশন হলে ন্যুনতম যোগ্যতা অর্জন হয় তখন এটা অর্জনে একসাথে দুই বা তিনটি আর্টিকেল কোনভাবে লিখে এডিটরের কাছে যাবে। গিয়ে অনুনয়, দয়া বা দাক্ষিণ্য চাইবে। বলবে স্যার আমারতো প্রমসনটা হচ্ছে না আমার এই আর্টিকেলগুলোর একটা acceptance দিলে এটা দিয়ে আপাতত কাজ চালিয়ে নিতে পারি। ইতিমধ্যে দুজন favourable reviewer দিয়ে রিভিউ করিয়ে accept করিয়ে নিন। এডিটররাও এসব সুযোগে থাকেন। কাউকে extra-ordinary favour দিলেইতো বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নির্বাচনে extra-ordinary সাপোর্ট পাওয়া যায়। আমি আজ পর্যন্ত আমার কোন সহকর্মীকে দেখিনি ওটা পড়তে। আমার pigeonhole-এ এই জার্নালটি প্রায়ই পাই আর আমি straight ওটা বিনে ফেলে দিই। শুধু আমি না আমাদের কবির স্যারকেও দেখেছি ওই একই কাজ করতে। প্রথম প্রথম ওটা একটু নেড়ে চেড়ে দেখতাম কিন্তু কোন কিছু শিক্ষার মত কিছুই পেতাম না।

Dhaka University Journal of Science-এর এডিটর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের, reviewer-ও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই হয়। পৃথিবীর কিছু কিছু নামী বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিজস্ব জার্নাল আছে। কিন্তু ওগুলোর editorial বোর্ড এবং reviewer সাধারণত অন্য বিস্বদিদ্যালয়ের হয় এবং এই প্রকাসনালোয়টি স্বায়ত্বশাসিত অর্থাত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রনের বাহিরে। আর আমাদের এখানে কোন একটি editorial পদ খালি হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন যায় প্রতিটি বিভাগ থেকে। আর বিভার বিষয়টি একাডেমিক মিটিং-এ আলোচনা করে একজন সিনিয়র most শিক্ষককে নির্বাচন করে। উল্লেখ্য এখানে ওই শিক্ষকের রিসার্চ প্রোফাইল নিয়ে কেউ আলোচনা করবেন না।

এখন আমাদের যদি এরকম জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত করে আমাদের প্রমসনগুলো ঠিকঠাক মত হয়ে যায় তখন কোন বলদে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করে অন্তরিজাতিক জার্নালে প্রকাশিত করার চেষ্টা করবে? এখন আমাদের যদি এরকম জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত করে আমাদের প্রমসনগুলো ঠিকঠাক মত হয়ে যায় তখন কোন বলদে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করে অন্তরিজাতিক জার্নালে প্রকাশিত করার চেষ্টা করবে? আনতর্জাতিক জার্নাল নিয়েও আমাদের fallacy কম না!! মানুষকে বোকা বানাতে বাঙালিদের জুড়ি মেলা দুস্কর। আমাদের অনেকেই আছেন যারা সিলন জার্নাল অফ physics বা পাকিস্তানি, ইরানি জার্নালে পাবলিশ করে। এখানে দুটো বিষয় ১) কাজটি ভালো না। ভালো হলেতো একটা ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর সম্পন্য জার্নালে পাবলিশ করত। ২) বিদেশী অর্থাত ভারতের কোন পাড়াগায়ের জার্নাল অথবা পাকিস্তানি, ইরানি জার্নালে পাবলিশ করে পাবলিকেশনকে আন্তর্জাতিক বলে চালানোর এক ধূর্ত মানসিকতা। আন্তর্জাতিক বলতে বুঝায় আন্তর্জাতিক মানের অর্থাত একটা জার্নাল যার নন-জিরো ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর আছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের শিক্ষকরা ভারতের কোন পাড়াগায়ের জার্নাল অথবা পাকিস্তানি, ইরানি জার্নালগুলোর খোজ পায় কিভাবে?

ভালো কাজের জন্য সিস্টেম থেকে একটা প্রেসার থাকতে হবে। ঢাকার খুব কাছের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়। এই জার্নালটির শুরুর ইতিহাস বেশ মজার। শুনেছি ওখানকার কয়েকজন শিক্ষকের অনেকদিন প্রমসন হচ্ছিল না প্রয়োজনীয় পাবলিকেশনের অভাবে। তাই কয়েকজন মিলে তৈরী করে ফেলল একটি জার্নাল আর প্রথম দুয়েকটা ইসুতে উনাদের প্রত্যেকের একাধিক আর্টিকেল প্রকাশিত করে খুব দ্রুতই তাদের প্রমসন হয়ে যায়। তারপর ওই জার্নাল অনেকদিন পর্যন্ত কোন ইসু প্রকাশিত হয়নি। যখন কিছু শিক্ষকের প্রয়োজন হয় তারা একজোট হয়ে আবার দুইয়েকটা ইসু প্রকাশিত করে আবার বন্ধ। এভাবেই চলছে ওটি। তার চেয়ে কাছের আরো একটি পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অধুনা একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়!!

আমার কাছে এই জার্নালগুলোকে অনেকটা দেয়ালিকার মত মনে হয়। কারো ইচ্ছে হলে এগুলো প্রকাশ করতে পারেন তবে প্রকাশিত আর্টিকেলগুলো পপুলার সাইন্স based হলে ভালো হয় যেন ছাত্র ছাত্রীরা পড়ে কিছু শিখতে পারে। তবে এসব জার্নালে প্রকাশিত করে প্রমসন নেওয়া যাবে না অর্থাত এগুলোকে শিক্ষকদের পাবলিকেশন হিসাবে চালিয়ে প্রমসন নেওয়া যাবে না

কামরুল হাসান
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

উপেক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা

এ এস এম মাকসুদ কামাল 

গত ৮ জুলাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি-দাওয়া ও প্রস্তাবিত অষ্টম বেতনকাঠামোতে অবমাননার বিষয় তুলে ধরেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনমতে, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গৌতম দাশ মন্ত্রীকে জানান, একবার সার্কিট হাউসে শিক্ষাবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তিনি এক সচিবের পাশে বসেন। জেলা প্রশাসক দেরিতে সভায় উপস্থিত হয়ে উপাচার্যকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে সেই আসনে নিজে বসেন। একজন উপাচার্যের প্রতি একজন
আমলার এ আচরণে শিক্ষক সমাজ ক্ষুব্ধ, অপমানিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের যথার্থতা এই আমলার আচরণেও নিহিত। প্রস্তাবিত বেতনকাঠামো ঘোষণার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন। সবাই দাবিগুলোর পক্ষে মতামত দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী উত্থাপিত দাবিগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট সচিবদের ডিও লেটার দিয়েছেন, জবাবে মন্ত্রী উত্তর পেয়েছেন কি না, জানি না। ডেইলি স্টার-এ ২৭ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে জনৈক সচিব বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ব্যাপকভাবে প্রমোশন পেয়ে থাকেন, তাঁদের দাবি পূরণ হলে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বইতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয়কে বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। অথচ সচিব মনে করেন, শিক্ষার বিনিয়োগ বোঝা।

শুধু বিএ পাস করে এমনকি শিক্ষাজীবনে একটি তৃতীয় শ্রেণি পেয়েও অনেকে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। আমলাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ কোটাভিত্তিক। বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমেও আমলা নিয়োগ করা হয়। গত কয়েক বছরে আমলাদের ব্যাপক প্রমোশন হয়েছে, তাই সিনিয়র সচিব, পদায়িত-অপদায়িত সচিবসহ নতুন পদের নাম যেমন শোনা যাচ্ছে, তেমনি আমলাতন্ত্রের অন্যান্য স্তরে প্রমোশনের ভারে জট লেগে যাওয়ার বিষয়ও আলোচিত। জীবনের সব পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অর্জনকারী সেরারাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। নির্দিষ্টসংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ থাকার পরেও ডক্টরাল ডিগ্রি না থাকায় অধ্যাপক হতে ন্যূনতম ২৫ বছর লাগে। ডক্টরাল ডিগ্রি থাকলে এবং স্বীকৃত দেশি-বিদেশি জার্নালে ন্যূনতম ১৫টি গবেষণা প্রবন্ধ থাকলে অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কিছু কম সময়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পদোন্নতি জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসৃজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—চাকরির বয়সসীমার সঙ্গে নয়। সচিব আরও বলেছেন, শিক্ষকদের চাকরিতে অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ বছর, আমলাদের ৫৯—শিক্ষকেরা একজন আমলার থেকেও বেশি সময় বেতন-ভাতা পান। একজন শিক্ষক বেশি বয়স পর্যন্ত চাকরি করেও আর্থিকভাবে একজন আমলা থেকে কতটুকু স্বাবলম্বী, তা এই সমাজ জানে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাজ, মেধা-অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ; করণিকের কাজ নয়। ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও শিক্ষকদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ বছর।
শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানে মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় প্রতিটি স্তরে শিক্ষকেরা মূল বেতনের প্রায় আড়াই গুণ ভাতা পান। ভারতে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও ইনক্রিমেন্টের কারণে সমতুল্য আমলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বেশি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হন, এটি বলা হয়। কিছু শিক্ষকের এ রকম সুবিধা আছে, যার অনুপাত ৭ শতাংশেরও কম। জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে সৎ পথে অর্থ উপার্জন করা কি অপরাধ? সরকারি অনেক কর্মকর্তাও বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। এতে প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জ্ঞান ব্যবস্থাপনার একটি সেতুবন্ধ গড়ে উঠছে।

প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান সপ্তম থেকে দুই ধাপ নামানো হয়েছে। সিলেকশন গ্রেড বাতিল হলে তা আরও নামবে। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের ১৬ ধাপের প্রতিবেদন সচিব কমিটিতে যাওয়ায় তাঁরা সপ্তমের ন্যায় ২০ ধাপের প্রস্তাব করেন। যুগান্তর-এ প্রকাশিত ১৪ মের তথ্যমতে, সচিব কমিটির প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোতে ধাপ ২২টি। সপ্তম বেতনকাঠামোতে সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকেরা গ্রেড-১-এ ছিলেন, যেখানে ৪০ হাজার টাকা নির্ধারিত ছিল, বেতন স্কেলের মূল কাঠামোতে মুখ্য সচিব বা মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সিনিয়র সচিবের মতো সুপার-গ্রেড ছিল না, যা এখন রাখা হয়েছে। এই বেতন স্কেলের ৩ অনুচ্ছেদের (২) পাদটীকায় ভাতা যোগ করে ৪৫ হাজার টাকা (নির্ধারিত) হবে। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে একটি প্রজ্ঞাপনে সিনিয়র সচিব পদ উল্লেখ করে মূল বেতনের সঙ্গে দুই হাজার টাকা ভাতা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা সপ্তম বেতন স্কেলে ছিল না। তাই প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোতে ২০টি গ্রেডের বাইরে দুটি সুপার গ্রেড রাখায় এখন ধাপ ২২টি, যা পাকিস্তানের চলমান বেতনকাঠামোর অনুরূপ। সচিব কমিটি সুপার গ্রেডের বেতন-ভাতা সরাসরি দ্বিগুণ বৃদ্ধি এবং অন্যদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণের কম বৃদ্ধির সুপারিশ করে, যা পক্ষপাতপুষ্ট ও নীতি-নৈতিকতায় অগ্রহণযোগ্য। স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নেই এমন কমিটি অষ্টম বেতনকাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করলে সবাই সুবিচার পাবেন।

শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানে মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় প্রতিটি স্তরে শিক্ষকেরা মূল বেতনের প্রায় আড়াই গুণ ভাতা পান। ভারতে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও ইনক্রিমেন্টের কারণে সমতুল্য আমলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বেশি। পাকিস্তানে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা কমিশন টেনিউর ট্র্যাক পদ্ধতি চালু করে উচ্চ মানের গবেষক-শিক্ষকদের উচ্চ বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে। এই পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বেসিক পে-স্কেলের শিক্ষকদের থেকে ন্যূনতম তিন গুণ বেশি বেতন পান। এমনকি দক্ষতা ও গবেষণার মান অনুযায়ী পাকিস্তানে বেসিক পে-স্কেলের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অধ্যাপককে বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ ২২তম ধাপ প্রদান করা হয়, যা মুখ্য সচিবের সমতুল্য। অধ্যাপকদের গ্রেড ২১তম, যা সচিবদের সমতুল্য। দেশটিতে একজন প্রভাষক চাকরি শুরু করেন ১৮তম ধাপে, যেখানে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার প্রারম্ভিক ধাপ ১৭তম।

এসব উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবি জানাই। স্বতন্ত্র বেতনকাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে প্রস্তাবিত অষ্টম বেতনকাঠামো পুনর্নির্ধারণ করে সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা সিনিয়র সচিবের সমতুল্য; অধ্যাপকদের সচিবের সমতুল্য; সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের বেতন ক্রমানুসারে নির্ধারণ করারও প্রস্তাব জানাই। এভাবে বেতন-ভাতা নির্ধারিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের জন্য আনুমানিক সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি টাকা প্রতিবছর বিনিয়োগ করতে হবে, যা হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে লোপাট হওয়া অর্থের ৮ শতাংশ মাত্র।

রাষ্ট্রীয় ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্কেল অনুযায়ী সম্মান দেওয়া হয়নি। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকদের অবস্থান ১৯তম সমবেতনের সচিবদের অবস্থান ১৬তম। এমনকি উপাচার্যদের ১৭তম অবস্থানে রাখা হয়েছে। জনগণের করের টাকায় প্রাপ্ত একই বেতনের একজনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বেশি, অন্যজনের কম—এ কেমন বিচার? তাই, বেতনকাঠামো নির্ধারণ করে, ওই সাপেক্ষে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করা হোক।

যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার আমলা গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে পান মাসিক ৪৫ হাজার টাকা। জনগণের করের টাকায় আমলারা যদি এ সুবিধা পেতে পারেন, তাহলে অন্যরা কেন পাবেন না? শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আট বছর চাকরির পর শুল্কমুক্ত গাড়ি কিনতে পারেন, যা পাঁচ বছর অন্তর নবায়নযোগ্য।

আমরা শিক্ষকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার কথাই শুধু বলছি না, শিক্ষকদের জবাবদিহির দিকেও নজর রাখা উচিত। ২০১৫-উত্তর বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের এজেন্ডায়ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন?

অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল: সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও মহাসচিব, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ কেন?

ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ : ১৩ জুলাই, ২০১৫
আজকাল বিভিন্ন মহল থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে নানা বিরূপ মন্তব্য করা হচ্ছে। কেউ কেউ নাকি বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ অধ্যাপকই প্রভাষক হওয়ার যোগ্য নন আর প্রভাষকরা শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন। এ ধরনের কথাবার্তার সত্যতা যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তবে জাতীয় বেতন কাঠামোতে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে এবং শিক্ষকদের দুই ধাপ নিচে নামিয়ে যেভাবে তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তাতে কথাগুলো অবিশ্বাস করতে পারি না। সেদিন এক ঘরোয়া আলোচনায় এক আমলা বলছিলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুর্নীতির আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রলোকের অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়সহ অন্যান্য
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর পড়াশোনা হয় না, শুধু দলবাজি হয়। শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেন না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি সময় দিতে গিয়ে নিজেদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করেন, দলবাজির মাধ্যমে বড় বড় সরকারি-বেসরকারি পদ হাসিলের অপতৎপরতায় তারা বেশি সময় কাটান, গবেষণা করেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাগুলো একদম মিথ্যা, তা আমি বলব না। তারপরও আমাদের অনেক কথা বলার আছে, যা আমি আমার এ প্রবন্ধে উপস্থাপন করব। ভদ্রলোকের মতে, শিক্ষকদের নিষ্ঠাবান হতে হবে, ঠিকমতো পড়াতে হবে, গবেষণা করতে হবে। নতুবা সব অযোগ্য শিক্ষককে চিহ্নিত করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করে দিতে হবে। সব অযোগ্য শিক্ষককে চিহ্নিত করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করে দেয়ার কথাটি বক্তার মুখের কথা, না মনের কথা, বোঝা গেল না। তা যদি নিছক মুখের কথা হয়, তবে কোনো কথা নেই। আর যদি মনের কথা হয়, তবে কিছু কথা আছে, সমস্যাও আছে। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যদি মঙ্গল হয়, তবে তাতে কারও অমত থাকার কথা নয়। কিন্তু কে নেবে বা কিভাবে নেবে এই পদক্ষেপ? এসব অযোগ্য শিক্ষককে মূল্যায়নের দায়িত্বই বা কে নেবে? কোন মাপকাঠিতে এদের যোগ্যতার বিচার করা হবে? কোন নীতিমালার ভিওিতে অযোগ্য শিক্ষকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করা হবে, তা কে ঠিক করবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায়ের কোনো নজির এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

গবেষণা প্রসঙ্গে একটু বলি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় প্রত্যেক শিক্ষককেই যথেষ্ট গবেষণা করতে দেখা যায় এবং তা প্রকাশিতও হয় বিভিন্ন জার্নালে। যদিও এসব প্রকাশনার গুণগত মান নিয়ে অনেকের মতো আমারও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ ধরনের গবেষণা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিচারে এসব প্রশ্ন ধোপে টেকেনি। আমি এমনও হতে দেখেছি- কোনোদিন ল্যাবে না গিয়ে শুধু শুভাকাক্সক্ষী সহকর্মীদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে কেউ কেউ অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধের অথার হয়ে গেছেন। এসব শুভাকাক্সক্ষী সহকর্মী দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আদৌ কোনো গবেষণা না করা সত্ত্বেও কারও কারও নাম তাদের গবেষণা প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের প্রমোশনে বা শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন উন্নতিতে সাহায্য করে আসছেন। অনেক বৈজ্ঞানিক শিক্ষক আবার এমন করিতকর্মা যে প্রতি দু-এক মাস অন্তর বিভিন্ন জার্নালে তাদের গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়। কোনো কোনো গবেষণা প্রবন্ধে অথার এবং কো-অথারের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে দেখা যায়! সিলেকশন কমিটিতে শুধু একসেপটেন্স লেটার উপস্থাপনের মাধ্যমে আজকাল অনেকেই শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন বা পদোন্নতি লাভ করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা প্রবন্ধের ম্যানুসক্রিপ্ট জমা না দিয়েই জার্নালের সম্পাদকের সঙ্গে সুসম্পর্কের বদৌলতে একসেপটেন্স লেটার সংগ্রহ করে এবং প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে ফায়দা লুটছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান উন্নয়নে গবেষণার নামে মূল্যবোধ ও নৈতিকতাবোধের এই অবক্ষয় জালিয়াতি বা দুর্নীতির সমতুল্য।
গবেষণার নামে এসব অপকর্ম আমরা সমর্থন করি না। তবে আমরা সমর্থন করি বা না করি, তাতে এসব তথাকথিত বিজ্ঞানীর কিছু আসে যায় না। প্রশাসনেরও কিছু আসে যায় না। কারণ তারা যুক্তি দেখান- গুণগতমানের বিচারে সব মানুষ সমান হয় না। কে করবে এসব গবেষণার মূল্যায়ন? কোনটি গুণগত মান সম্পন্ন বা কোনটি নয় তার বিচারও আপেক্ষিক। যোগ্যতার মাপকাঠিতে সব শিক্ষক যেমন সমান হয় না, সব গবেষণার মানও তেমন এক হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এ প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক হওয়ার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা আছে। এ ন্যূনতম যোগ্যতা না মেনে যদি অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হয়, তার দায়ভার বহন করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের। তারা যদি কোনো প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, গুণগত মান এবং গবেষণার সংখ্যা ও মান যথার্থভাবে মূল্যায়ন না করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি দিয়ে থাকেন, তবে এই দুর্নীতি বা অনিয়মের জন্য গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে প্রথমে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের বিদায় দিতে হয়। কিন্তু তা দেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন শুধু মাননীয় আচার্য। আবার মাননীয় আচার্য যদি তার দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় অযোগ্য উপাচার্য বা প্রো-উপাচার্য নিয়োগ দেন, তবে অযোগ্য শিক্ষক বা অযোগ্য অধ্যাপক তৈরি হবেন এটাই তো স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে অযোগ্য শিক্ষকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় দেয়ার পরিবর্তে অযোগ্য শিক্ষক ও অধ্যাপক তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া অধিক ফলপ্রসূ নয় কি? এখন আবার গবেষণা রাজনীতির পরিপূরক। অনেক শিক্ষক গবেষণার জন্য ভালো ছাত্র-ছাত্রী শিকার করে বেড়ান, যাতে করে তাদের পাস করিয়ে শিক্ষক বানিয়ে দল ভারি করা যায়। এসব শিক্ষকের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকে। উল্টো রাজনৈতিক দলগুলো এদের সব রকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ শিক্ষক এ রকম নয়। আর তাই হয়তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও পচে যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করতে চাই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। শুধু শিক্ষাদীক্ষায় নয়, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র সমাজের অবদান অপরিসীম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ছাত্র আন্দোলন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অন্যায়-অত্যাচার, দুর্নীতি, শোষণ-নিষ্পেষণ, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া ও জীবন উৎসর্গ করার ব্যাপারে সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের একটি অগ্রণী ভূমিকা ছিল। এই ঐতিহ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব, মান-মর্যাদার প্রতীক। এই ঐতিহ্য যেমন উজ্জ্বল, তেমনি সমুন্নত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৪ বছরের ইতিহাস শুধু মানমর্যাদা, ঐতিহ্য আর ক্রমোন্নতির ইতিহাস নয়। স্বাধীনতা অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৪৫ বছরের ইতিহাস অনেক উত্থান-পতনের ইতিহাস। আনন্দ-বেদনা, প্রত্যাশা আর হতাশার ইতিহাস। এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অঘটন ঘটেছে; হত্যা, রাহাজানি, খুনখারাবি হয়েছে, অসংখ্য লাশ পড়েছে, বহুবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, সেশনজটে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, জর্জরিত হয়েছে ছাত্র-শিক্ষক, ক্ষতিগ্রসস্ত হয়েছে জাতি। স্বাধীনতা উত্তরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেপরোয়া ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, রাজনীতির পেছনে সরকারি-বিরোধী দলের মদদদান, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কর্তাব্যক্তিদের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও দুর্নীতি, শিক্ষকদের কনসালটেন্সি, এনজিও এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আর্থিক ফায়দা অন্বেষণ, ক্লাস ফাঁকি এবং কর্তব্যকর্মে অবহেলা যার ফলস্বরূপ শিক্ষার মানের অবনতি, সর্বত্র দলাদলি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের রাজনীতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর অপব্যবহারসহ আরও বহু অভিযোগ সর্বক্ষেত্রে অমূলক ও অসত্য নয়। তবে এসবের জন্য একক ও ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করাটা অন্যায় হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় আইসোলেটেড বা ইনসুলেটেড কোনো দ্বীপ নয়। দেশের ক্রমাবনতিশীল সার্বিক পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাঙ্গনে পড়বে না- এ ধরনের অবাস্তব মনোভাব পোষণ করা সমীচীন নয়।
অনেকে মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ অপব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা ধ্বংস করছেন। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল ওয়ান ম্যান, ওয়ান ভোট কনসেপ্ট। এই কনসেপ্ট প্রভাষক থেকে প্রফেসর পর্যন্ত সবাইকেই সমভাবে পরম ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত করে। এই ওয়ান ম্যানের ওয়ান ভোট বিভিন্ন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এত বেশি অপরিহার্য বলে গণ্য হয় যে, ভোটার শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে শিক্ষকরা প্রার্থী হিসেবে যেভাবে ভোট ভিক্ষা করেন এবং প্রতিশ্র“তি দিয়ে থাকেন, তাতে করে নবীন শিদকদের মধ্যে অনেকেই বুঝে ফেলেন যে, যোগ্যতার চেয়ে সাফল্যের সিঁড়ি হল রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়। এ কারণেই অনেক শিক্ষক পড়াশোনা আর গবেষণা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে রাজনীতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত হন বেশি। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অপরাজনীতির প্রত্যক্ষ মদদদাতা। জনমনে আরও একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেউ কেউ স্বায়ত্তশাসনকে খুব নোংরাভাবে অপব্যবহার করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কারও দ্বারা, কোনো নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন না। তিনি নিজের বিবেকের কাছে নিজে দায়বদ্ধ থাকবেন, এটা সবাই আশা করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। আইন-কানুনের জটিলতা, সংগঠনের চাপ এবং লবিং, স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা এবং দলীয় পরিচিতিসহ তথাকথিত মানবতাবোধ আমাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ সংরক্ষণকেই বেশি উৎসাহী করে আসছে এবং এখনও করছে। এসব কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সামনেও হবে।
আমি আগেই বলেছি, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে আইসোলেটেড ও ইনসিউলেটেড দ্বীপ হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, খুন-খারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ, ঘুষ, কালোবাজারি দৈনন্দিন জীবনের নিত্যনৈমিওিক ঘটনা, যে দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতেও জানমালের নিরাপত্তা থাকে না, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সন্ত্রাসের উস্কানি দেয়া হয়, যে দেশে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা একে অপরের চরিত্র হননের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, কাদা ছোড়াছুড়িতে সদা সচেষ্ট, সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে দেশের পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত, পুত-পবিত্র তীর্থস্থান এবং দেশের সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাব ছাত্র-শিক্ষকের ওপর পড়বে না- এসব ভাবার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দেশের পাঁচ/দশজন মানুষের মতোই মানুষ। সবার মতো শিক্ষকদেরও চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ-অনুভূতি রয়েছে। কাক্সিক্ষত না হলেও অন্য পেশার মানুষের মতো শিক্ষকদেরও পদস্খলন ঘটে এবং তারা মাঝে মাঝে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আমাদের দেশে একজন কাস্টম অফিসার বা পুলিশ অফিসার ঘুষ খেয়ে কোটিপতি হলে একে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে গণ্য করা হয়, কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এনজিও, কনসালটেন্সি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মাধ্যমে কিছু বাড়তি উপার্জনে তৎপর হলেই হৈচৈ পড়ে যায়। একজন শিক্ষককে সৎ ও দায়িত্ববান হতে বলবেন, আর তার ভরণপোষণের জন্য ন্যূনতম অর্থ জোগান দেবেন না, তা কি হয়? সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবিরোধী আমলা ও নীতিনির্ধারকদের জিজ্ঞেস করি- আপনারা কি জানেন, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় শিক্ষকদের কী মর্যাদায় রাখা হয়েছে এবং সেসব দেশে শিক্ষকদের বেতন কত? বলছি শুনুন। ভারতে একজন অধ্যাপকের সর্বনিু বেতন ১ লাখ ৩৫ হাজার রুপি, যেখানে সেদেশের কেবিনেট সেক্রেটারি বেতন পান ৯০ হাজার রুপি। পাকিস্তানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সর্বনিু বেতন ২ লাখ ৩৪ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ৪ লাখ ৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি। আর শ্রীলংকায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সর্বনিু বেতন ১ লাখ ৩৫ হাজার শ্রীলংকান রুপি। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় শিক্ষকরা মূল বেতনের ৩৫-৫০ শতাংশ গবেষণা ভাতা পেয়ে থাকেন। আর বাংলাদেশে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রতি মাসে ৭৫০ টাকা গবেষণা ভাতা দেয়া হয়। ড. ফরাসউদ্দিন পে কমিশনের সম্মানিত সদস্য ও আমলারা এসব পরিসংখ্যান জানেন বা জানতেন বলে মনে হয় না। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরও কেটেছেটে আমি বেতন পাই মাত্র ৩০ ও ৪০ হাজারের মাঝামাঝি। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা আপনারা ভোগ করে থাকেন, তার কয়টি আমরা ভোগ করি মাননীয় সচিব ও সিনিয়র সচিবগণ? আপনাদের মনে রাখা উচিত, আমরাই আপনাদের গুরু, আমরাই আপনাদের কারিগর। অর্থকড়ির কথা বাদ দিলাম, অন্তত সম্মানটুকু দিতে কার্পণ্য করবেন কেন?
আমাদের সবার কিছু না কিছু দোষক্রটি রয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক, প্রশাসন, নেতা-নেত্রী, দেশবাসী- কেউই এ থেকে মুক্ত নন। শিক্ষাঙ্গনে যেসব দোষক্রটি আমাদের অপছন্দ, তা থেকে উত্তরণে আমাদের সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে। শুধু শিক্ষকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। যদি কোনোদিন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করা যায়, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং মানোন্নয়নের জন্য ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির ওপর থেকে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করা হয়, তখনই শুধু দলীয় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ছুড়ে ফেলে দিয়ে আইনকানুন এবং বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে আমরা নিজেদের অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে রক্ষা করতে পারব এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত করে সম্মানজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারব।
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর, ক্লিনিক্যাল ফামের্সি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্য্যলয়

Wednesday, August 5, 2015

গবেষণায় অর্থ ব্যয় করে না ১০ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

সাইফ সুজন | ২০১৫-০৮-০৫ ইং


গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, ধারণ ও বিতরণ— এই হলো উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। আর বিষয়ানুগ গবেষণার ক্ষেত্রে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার চিত্র অত্যন্ত নাজুক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনই
(ইউজিসি) বলছে, ২০১৩ সালে দেশের মোট ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টিই গবেষণার পেছনে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। আর কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি, এমন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১৫টি। তাই গবেষণাবিহীন শিক্ষার মাধ্যমে সনদধারী শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেও তৈরি হচ্ছে না দক্ষ জনশক্তি, এমনটাই বলছেন শিক্ষাবিদরা।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. অজয় রায় এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে স্লোগানে স্লোগানে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। আর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয় না বা গবেষণা ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয় না, সেগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে না; সেগুলোর মান কলেজ পর্যায়ের।’
চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এটি দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও। অথচ চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণার জন্য ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে কোনো অর্থই ব্যয় করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক রুহুল আমিন ভূইয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে ব্যয় করা না হলেও ইউজিসির উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক বাজেটে গবেষণা খাতে খুব কম বরাদ্দ দেয় ইউজিসি।
বস্ত্র শিল্পে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়। দেশে পোশাক শিল্পের অগ্রগতির লক্ষ্যে আধুনিক মানের টেক্সটাইল প্রকৌশলী গড়ে তুলতে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। ইউজিসি প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। গবেষণা খাতে কোনো ব্যয় ও বরাদ্দও নেই তাদের। তাই বাস্তবায়ন হয়নি কোনো ধরনের গবেষণা প্রকল্প।
গবেষণা খাতে অর্থ ব্যয় না হওয়ার কথা স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গবেষণা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিষয়। গবেষণা খাতে কোনো অর্থ ব্যয় না হওয়াটা আসলে দৃষ্টিকটু। শিক্ষকরা বিদেশ থেকে গবেষণা করে আসেন। তবে দেশে ফিরে শিক্ষকরা ওভাবে আর গবেষণা করেন না।’
প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা হয় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগার থেকে গবেষণায় কোনো অর্থ ব্যয় করেনি প্রাণিসম্পদ বিষয়ে দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি।
গবেষণায় ব্যয় না করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস মাহফুজুল বারী বলেন, ইউজিসি বার্ষিক যে বাজেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদন দেয়, তা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই শেষ হয়ে যায়। ফলে মোট বরাদ্দে গবেষণার জন্য আর উল্লেখযোগ্য অংশ থাকে না।
ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত ৪০তম বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণা খাতে কোনো অর্থই ব্যয় হয়নি, এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আরো রয়েছে— ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি), বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গবেষণা প্রকল্পও বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি।
প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বরাদ্দ, শিক্ষকদের গবেষণার চেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস গ্রহণ, কনসালট্যান্সি ও প্রেষণে অন্যত্র চাকরির প্রতি আগ্রহ, গবেষণার গুরুত্ব অনুধাবন না করাকেই এর কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ রয়েছে। সবাই এখন ডিগ্রি অর্জনের দিকে ঝুঁকছে; গবেষণার দিকে নয়। অথচ জ্ঞান সৃষ্টি হয় গবেষণার মাধ্যমে। ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ালেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হয় না। শিক্ষকরা বেশির ভাগ সময় শিক্ষাদানে ব্যস্ত থাকেন। অবসরে গবেষণা করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন। এছাড়া গবেষণা করার জন্য মানের শিক্ষকের সংখ্যাও অপ্রতুল।’
দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছরই খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ। বাড়ছে শিক্ষক সংখ্যাও। তবে এর কোনো সুপ্রভাবই দেখা যাচ্ছে না গবেষণা ক্ষেত্রে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান নেই। নেই আন্তর্জাতিক মানের কোনো প্রকাশনাও।
ইউজিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে গবেষণা খাতে সর্বাধিক ব্যয় করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণা প্রকল্প পরিচালনায় মোট ২ কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় করে এ বিদ্যাপীঠ, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম। দ্বিতীয় সর্বাধিক ১ কোটি ৭২ লাখ ৪২ হাজার টাকা ব্যয় করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। গবেষণা প্রকল্পের দিক দিয়েও এগিয়ে রয়েছে বাকৃবি। এর গবেষণা প্রকল্পের সংখ্যা ১৩৬টি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) গবেষণার জন্য ব্যয় করেছে মাত্র ৫৫ লাখ টাকা। আর বছরজুড়ে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়িত গবেষণা প্রকল্পের সংখ্যা মাত্র ৭। গবেষণা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হলেও কোনো গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি এ বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণাকে উৎসাহিত করা না হলেও কিছু আগ্রহী শিক্ষক ব্যক্তিগত উদ্যোগে গবেষণাকর্ম পরিচালনা করছেন। এসব গবেষণা বিশ্বের নামকরা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ ধরনের আগ্রহী শিক্ষক সংখ্যায় কম হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের গবেষণা খাত আরো সমৃদ্ধ হবে।
Source: http://www.bonikbarta.com/news/details/45094.html

কর্মবিরতি

Click to view photos