Tuesday, July 7, 2015

বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষক পাওয়া যাবে না!

ড. আবদুল্লাহ ইকবাল॥


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাকি বলা হয় ‘জাতির বিবেক’। কী কারণে এমনটি বলা হয় তার সঠিক উত্তর মনে হয় আমার মতো অনেকের অজানা। শিক্ষকতায় আসার আগে ‘জাতির বিবেক’ হবো এমনটি চিন্তা করিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে একটু ভালো ফল করায় স্বপ্ন দেখেছিলাম শিক্ষক হওয়ার। আল্লাহর রহমতে সুযোগও পেয়ে গেলাম। আর অমনি হয়ে গেলাম তথাকথিত ‘জাতির বিবেকের’ অংশ। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর প্রথম যখন গ্রামের বাড়িতে
গেলাম তখন পাড়া-পড়শী, দাদা-চাচা থেকে শুরু করে সবাই জিজ্ঞাসা করছেন, ‘এত্ত এত্ত পড়ালেখা করে মাস্টারি চাকরি পাইলা- এসপি, ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারলা না …’ ইত্যাদি আজব আজব প্রশ্ন! আসলে তারা তো আমার জন্য অনেক বেশি আশাবাদী ছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, আমি পড়ালেখা শেষ করে ভালো কিছু করব বা হতে পারব! কারণ তখনও আমার গ্রামের বা আমি যে স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি সেখান থেকে হাতেগোনা দু-একজন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। অনেকেই জানতে চেয়েছেন বেতন কত পাই? এর উত্তর সরাসরি না দিলেও তারা ঠিকই জেনে বা বোঝে গেছেন! কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, ‘পড়াশোনার অনুপাতে বেতনটা কম হয়ে গেছে।’ এই নিয়ে বাড়ির পাশের রাস্তায় বসে একের পর এক আলোচনা চলছেই। মনে হচ্ছে, আমার খুশি বা আনন্দের চেয়ে গ্রামবাসীর হতাশাই বেশি! তাদের একটাই আর্তনাদ, এতদিন পড়ালেখা করেও ‘মাস্টার’ (যদিও কারও কারও ভাষায় ‘প্রফেসর’)। এর আরেকটি কারণ ছিল, আমার বাবা ছিলেন প্রাইমারির শিক্ষক। আর মাস্টার মানেই সবাই এক! তাই সবার ভেতরে হতাশা। সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের একপর্যায়ে একজন কৌতূহলী বৃদ্ধ মানুষ জিজ্ঞেস করে বসলেন, কোন সাবজেক্ট পড়াই, কাদের পড়াই বা আমার ছাত্ররা পাস করে কোথায় কোথায় চাকরি পায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যখন বললাম, আমার ছাত্ররা এসপি হতে পারবে বা হবে, ম্যাজিস্ট্রেট হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, কৃষিবিদ হবে …তখন তারা একটু আগ্রহ ভরেই শুনছিল। যাই হোক, এই ধারণা অনেকটাই ভাঙল অন্য একজনের কথায়। তার ভাষায়, উপজেলা বা থানাতে যেসব অফিসার আছেন (যেমন নির্বাহী কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ইত্যাদি) তারা আমার মতোই কোনো না কোনো শিক্ষকেরই ছাত্র। তখন সবাই খুশি। তার মানে তাদের সবার স্যার আমি! এবার তারা অনেক খুশি! তাহলে আমার চাকরিটা মোটেই খারাপ না বা ছোট না!
আমার পরিচিত বা বন্ধু-বান্ধবের বেলায় দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা বিসিএস দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা হয়েছে। তাদের সঙ্গে বা অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজেকে কখনও তুলনা করতে চাইনি। সবকিছু জেনেই শিক্ষকতায় এসেছি। এখানে ভোগবিলাস বা সুযোগ-সুবিধা নিতান্তই কম বা উল্লেখ করার মতো না। তবুও একজন ভালো ছাত্র বা ভালো মানুষ হিসেবে সমাজের স্বীকৃতিটুকু আছে_ এটিই কম কিসের? কিন্তু কিছু দিন আগে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদন এবং তৎসংক্রান্ত সচিব কমিটির পর্যালোচনার বিষয়ে কিছু জিনিস জেনে অনেকের মতো আমিও একটু লজ্জা ও অপমানিত বোধ করছি। একই সঙ্গে সরকারের ভূমিকাকেও আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছে। বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় যত দিন স্বাবলম্বী না হবে, ততদিন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। অন্যদিকে, সচিব কমিটির সুপারিশ বা প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ২০০৯ সালে বাস্তবায়িত বেতন কাঠামোর পদমর্যাদা থেকে দুই ধাপ নামিয়ে আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো শিক্ষকের জন্য তা অত্যন্ত অবমাননার শামিল। সরকারের কাছে খুব জানতে ইচ্ছা করে, এই প্রতিবেদনটি কিছু অতি উৎসাহী পদস্থ আমলার অযাচিত নগ্ন হস্তক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ, নাকি বাস্তবতা?
শিক্ষকতা জীবনে কখনও পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব মিলাতে যাইনি। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো ফল করেছি, তাদেরই একটি অংশ শিক্ষকতায় আসতে পেরেছি। অনেকেই সে সুযোগ পায়নি। কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে কর্মরত। এটি মনে হয় কেউই অস্বীকার করবে না যে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগেরই সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবনের স্বপ্নই থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। না পারলে অন্য কোথাও_ প্রশাসন বা অন্য ক্যাডারে। আর তাদের থেকেই একদিন হয়ে ওঠেন প্রজাতন্ত্রের জাঁদরেল আমলা! দিকনির্দেশনা দেন সরকারকে_ কীভাবে দেশ চালাতে হবে …। এই ধারাবাহিকতায়ই সম্ভবত প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করার এই ‘অভিনব প্রয়াস’। যতটুকু জানি, সচিব হওয়ার প্রাথমিক ধাপগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরাই বড় ভূমিকা পালন করেন। তাদের বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, খাতা মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা নেওয়াসহ আনুষঙ্গিক কার্যাবলির একটি বৃহৎ অংশই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘অবহেলিত’ শিক্ষকরাই করে থাকেন। তার পরও শিক্ষকদের প্রতি এ কেমন আচরণ? এ কি কৃতজ্ঞতাবোধের অভাব নাকি নেহাতই ধৃষ্টতা? আবার যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাবলম্বী করার নামে শিক্ষাকে ‘অভিজাত পণ্যে’ পরিণত করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সুযোগ্য গভর্নর বা এমন অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিই হয়তো উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেন। এটি কি আমাদের কারও কাম্য হতে পারে? এমনটি ঘটলে রাষ্ট্র কি এর দায়ভার এড়াতে পারবে? সরকার কি চোখ বুঝে তা নীরব দর্শক হয়ে কেবল উপভোগ করবে নাকি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হবে।
আসলে শিক্ষাকে আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করে থাকে একটা অনুৎপাদনশীল খাত বা বিনিয়োগ হিসেবে। মনে করা হয়, এখান থেকে কোনো ‘রিটার্ন’ আসবে না। এটিই হলো আমাদের বড় সমস্যা। এমনিতেই বিভিন্ন স্তরের সম্মানিত শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে অপমানিত বা নাজেহাল করা হয়েছে_ সেটি সংসদের ভেতর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট বা পরীক্ষার হলে সর্বত্র! কখনও মুখে, কখনও গায়ে হাত উঠিয়ে। কখনও রাজনীতিবিদদের দ্বারা। কখনও পোশাক পরিহিত বাহিনীর হাতে, আবার কখনও সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তার দ্বারা! এসবই মিডিয়ার বদৌলতে দেশবাসী জেনেছে। বেতন কাঠামোর এই দুটি সুপারিশ বা প্রতিবেদন বাস্তবায়িত হলে এই ধারণা বা কর্মকাণ্ডগুলোকে আরও পাকাপোক্ত করে তুলবে। একদিকে এটি শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করার মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ সৃষ্টি করবে; অন্যদিকে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসার আগ্রহ হারাবে বা অনীহা প্রকাশ করবে। এতে করে ‘জাঁদরেল আমলা’র জন্মদাতা প্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেধাশূন্য হয়ে পড়বে এটা নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যেতে পারে। আমলারা কি মনে করেন শিক্ষকরা কিছুই করেন না? তারা একবারও স্মরণ করতে চেষ্টা করেন না যে, তাদের মতো জাঁদরেল আমলা সৃষ্টিতে এই ‘অকর্মা’ শিক্ষকরাই কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধায় সন্তুষ্ট না হয়ে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। আর প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো কার্যকর করলে এর মাত্রা বাড়বে বহুগুণে। যার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। তাই সরকারকেই এটি গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্য অনেক মন্ত্রী মহোদয়ের মুখে বিগত কয়েক বছরে অসংখ্যবার শুনেছি সব শিক্ষকের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদান করতে সরকার সচেষ্ট। তাহলে কি ধরে নেব এটি সেই প্রচেষ্টার প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন? শিক্ষকদের এই সম্মানটুকু দিতে রাষ্ট্রের এত কার্পণ্য কেন? এতে করে কি রাষ্ট্রের অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে? ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রস্তাবিত সুপারিশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। সরকার বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ না করলে এর দায়ভার সরকারের ওপরই বর্তাবে, আমলাদের ওপর না।

লেখকঃ
সহযোগী অধ্যাপক, ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প
বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
Source: http://www.esamakal.net/pop_up.php?img_name=2015%2F06%2F12%2Fimages%2F05_100.jpg

কর্মপদ্ধতিঃ শিক্ষকতা ও অন্যান্য

Kamrul Hassan

অনেক আমলা এমন কি সাধারণ মানুষও মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ কর্ম তেমন নেই। তারা ভাবে দিনে মাত্র ১-২ অথবা ৩টি ক্লাস অর্থাত ১ থেকে ৩ ঘন্টা কাজ বাকি পুরো দিনই অবসর। আর তাইতো তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন চাকুরী করতে পারেন। বুঝতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে ১ ঘন্টার একটা ক্লাস শুধু ১ ঘন্টার ব্যাপার না। Ideally বলতে গেলে প্রতি ১ ঘন্টার ক্লাসের পিছনে অনেক ঘন্টার রাত জেগে ক্লাস প্রিপারেশন, lecture নোট প্রিপারেশন, এসাইনমেন্ট প্রিপারেশন, ক্লাস টেস্টের খাতা দেখা ইত্যাদি আছে। তারপর আছে গবেষণা। গবেষণার জন্য ভাবতে হয়। যত বেশি ভাবনা তত বেশি নতুন নতুন রিসার্চ আইডিয়া আসার সম্ভবনা। এমনকি কি আমরা বাথরুমে (কি শাওয়ারের নিচে, কি কমোডে বসা) থাকার সময়ও ভাবি। সমস্যা হলো এই ভাবনার সময়টাকে অনেকে অলস সময় কাটানো মনে করে। সমস্যা হলো আমরা এখানে ক্লাসের বাহিরের সময়টা পুরোটা এইভাবে ব্যায় করিনা। আমরা এই সময়ের বেশ কিছুটা সময় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে কিংবা কেউ কেউ consultancy করে ব্যায় করি। প্রশ্ন হলো এগুলো কি কেউ সাধে করে? সাধে কেউ ২-৩ ঘন্টার জ্যাম পেড়িয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যায় না। এগুলোর মধ্যে আনন্দ নেই গ্লানি আছে। সরকারী কর্মচারীরাতো ঘুষ বা দুর্নীতি করে সংসার চালাতে বেতনের বাহিরে অতিরিক্ত যা লাগে তা কামিয়ে নিতে পারেন। শিক্ষকরা কিন্তু কষ্ট করে ওই জ্ঞান বিতরণ করেই অতিরিক্ত কিছু উপার্জন করে। দুর্নীতি করে না। তবে হ্যা, এগুলো করতে গিয়ে নিজের কর্মস্থলের ছাত্রদের বঞ্চিত করা হয়। কারণ একজন শিক্ষক যদি আজকালকার এই অসহনীয় জ্যাম পেড়িয়ে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তখন তার আর কোন শক্তি বা ইচ্ছে আর অবশিষ্ট থাকে না নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দেওয়ার মত। আজ যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই পরিমান বেতন দেওয়া হয় আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তত সেটাও দেওয়া হত তাহলেও আমি নিশ্চিত অনেকেই আর ওখানে যেত না। আমাদের শিক্ষকরা কিন্তু তাদের মেধা এবং শ্রম পুরোটা তার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দিচ্ছে না। তারপরও এই স্বল্প পরিমানেই আমাদের ছেলেমেয়েরা খারাপ করছে না। আর এই শিক্ষকরাই যদি তাদের পুরোটা দিত তাহলে আমি নিশ্চিত আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হত (যদিও এসব ট্যাগ লাগানো আমার একদম অপছন্দ)।

শিক্ষকদের দাবিতো সকলের দাবি হওয়া উচিত। তাকিয়ে দেখুন এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতে আর তুলনা করুন ওখানকার বিশবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আর আমাদের শিক্ষকরাদের। জিবনযাত্রার ব্যায় কিন্তু আমাদের ঢাকাতে কলকাতার তুলনায় বেশি ছাড়া কম না। আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষদের একটি ন্যায্য বেতন দেওয়া হত তাহলে শিক্ষকরা তাদের অন্যত্র ব্যায় করা সময়টা তাদের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দিত। তাতে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা তাদের শিক্ষকদের আরো নিবিরভাবে পেত। শিক্ষকরা তাদের গবেষণায় আরো মনোনিবেশ করতে পারত। প্রশ্ন হলো শিক্ষকদের একটা ন্যায্য বেতন দিতে সরকারের অতিরিক্ত কত টাকা খরচ হবে? অতিরিক্ত এই টাকার পরিমান আর তার বিনিময়ে অতিরিক্ত যে প্রাপ্তি হবে সেটা বিবেচনা করলে আমি নির্দিধায় বলতে পারি বাংলাদেশে কেউ ওই পরিমান টাকা খরচ করে এর চেয়ে বেশি মুনাফা (জ্ঞান অর্জন এই ক্ষেত্রে) আর অন্য কোনভাবে সম্ভব না, সিম্পলি না। এই দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত এটা যত শীঘ্র বুঝতে পারবে রাষ্ট্রের কল্যাণ তত শীঘ্র হবে। কিন্তু অষ্ঠম জাতীয় বেতন বোর্ড শিক্ষকদের যা ভাবে সম্মান এবং সম্মানী নিয়ে টানা হেচড়া করছেন তাতে শিক্ষা ক্ষেত্রে ভয়ানক নৈরাজ্য চলে আসবে। এই অবমাননাকর বেতন স্কেল বাস্তবায়িত হলে উচ্চ শিক্ষার মান আরো এক ধাপ নিম্নগামী হবে। তাই বলি মনা ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

কামরুল হাসান
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Sunday, July 5, 2015

আমলানির্ভর দেশ ও শিক্ষাব্যাবস্থা

Kamrul Hassan

মন্ত্রনালয়ের আন্ডারে অর্থাত মহা-কেরানী নিয়ন্ত্রিত কোন সরকারী বা আধা-সরকারী সংস্থা কি আজ পর্যন্ত কোন ভালো কাজ successfully করতে পেরেছে? এরকম উদাহরণ কি আছে? আমাদের "বিমান", আমাদের পাটকল, আমাদের চিনিকল, আমাদের সরকারী ব্যাংক ইত্যাদি কোন কিছু তারা successfully চালাতে পেরেছে? আশ্চর্য্যের বিষয় হলো বাংলাদশ আনবিক শক্তি কমিসনের মত একটি প্রতিষ্ঠানও মন্ত্রনালয়ের আন্ডারে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। এই আমলারা একজন ডাক্তারকে এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বানিয়েছিল। পৃথিবীর কোথাও এরকম নজির আগে ছিল না, এখন নেই আর ভবিষ্যতে হবেও না। আনবিক শক্তি কমিসন নামটি উচ্চারণ করলেই মানস পটে ভেসে উঠে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পদার্থবিদে গিজ গিজ করবে আর তাদের সাপোর্ট-এ থাকবে প্রধানত ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্যরা। খোজ নিয়ে জেনেছি বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিসনে পদার্থবিদরা কোনঠাসা হয়ে আছে। আর ওখানকার বৈজ্ঞানিকদের বিজ্ঞান চর্চা থেকেও বড় কাজ হলো বিজ্ঞান মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী সচিবদের দরবারে ধরনা দেওয়া। এখানে কোন গবেষণা নেই। গবেষকদের যদি এভাবে মন্ত্রনালয়ে দৌড়ের মধ্যে রাখে তাহলে গবেষণা হবে কিভাবে? ঘুরে আসুন একবার মুম্বাইয়ের ভাবা আনবিক শক্তি কমিসনে দেখবেন আনবিক শক্তি কমিসন কাকে বলে!!

আরো একটি প্রতিষ্ঠান হলো BCSIR (আমরা যাকে সাইন্স ল্যাব বলে চিনি) যেটা বিজ্ঞান মন্ত্রনালয়ের আন্ডারে এবং ওটার অবস্থা আরো করুন। মন্ত্রনালয়ের লোকজনদের দেখেছি ওখানে যন্ত্রপাতি দিতে খুবই উৎসাহী কারণ ওখানকার যবতীয় ক্রয় কার্য্যক্রম মন্ত্রনালয় করে থাকেন। যত বেশি কেনাকাটা তত বেশি লাভ। নিজের লাভতো বলদেও বুঝে, তাই না? তাইতো দেখা যায় ওখানে অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে ভরপুর যেগুলো বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যন্ত নেই। ওখানে কি কাজ হয় কেউ কি যাচাই করে দেখেছে? উন্নতমানের চুলা প্রযুক্তি জাতীয় কিছু কাজ করে। তার জন্য রাধানীর প্রাণ কেন্দ্রে এত লোকবল দিয়ে তৈরী একটা প্রতিষ্ঠানে কোন আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা নেই। এরকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে যার মাধ্যমে প্রমান করা যাবে কেমন অদক্ষ তারা।

অন্যদিকে নাম মাত্র বরাদ্দে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরং অনেক বেশি ভালো কাজ করছে। এই স্বল্প বরাদ্দের কারণও আমাদের মন্ত্রনালয় আর তাদের সচিবরা। এত কম অর্থাত নগন্য বাজেট দিয়েও আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুল সংখ্যক ছেলেমেয়েদের আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় শূন্য বাজেট দিয়েও আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, সংখ্যায় কম হলেও, করে যাচ্ছেন। আমি challenge দিয়ে বলতে পারি এত কম বাজেটে এই পরিমান আন্তর্জাতিক গবেষণা পৃথিবীর কোথাও করতে পারবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কে যে পরিমান টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় তা থেকে যে পরিমান টাকা গবেষণার জন্য দেওয়া হয় ওই পরিমান টাকা পৃথিবীর শ্রেষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে দিয়ে দেখুন আমাদের সমান পরিমান গবেষণা করতে পারে কিনা!! আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি মন্ত্রনালয়ের আন্ডারে হত। শুধু একবার কল্পনা করুন যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মন্ত্রনালয়ের আন্ডারে আর আমাদের শিক্ষকরা তাদের প্রমোসনসহ অন্যান্য কাজে মন্ত্রনালয়ে দৌড়াচ্ছে! উফ, কি বিচ্ছিরি চিত্র!! এরা ঠিক এমনি। তাদের ক্ষমতা আর তাদের জ্ঞান এই দুটো commensurable না।

সমালোচনার সময় ষোলো আনা আর দেওয়ার সময় ১ আনাও না। যারা তুলনামূলক দক্ষতার পরিচয় দেয় তাদের সম্মান এবং সম্মানী কমিয়ে যারা অদক্ষ হিসাবে প্রমানিত তাদের সম্মান এবং সম্মানী বাড়িয়ে এদেশের উন্নতি কি সম্ভব? এই দেশে সব কিছু Anomalous সব!!

কামরুল হাসান
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Thursday, July 2, 2015

দল ও নিয়োগ নৈরাজ্যে বিশৃঙ্খল উচ্চশিক্ষা

শরীফুল আলম সুমন
উচ্চশিক্ষার সার কথা গবেষণা। অথচ এ খাতই সবচেয়ে অবহেলিত, বরাদ্দও নামমাত্র। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের লেখাপড়া পুরোপুরি মুখস্থবিদ্যা-নির্ভর। শিক্ষাবিদদের মতে, গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষা কোনো শিক্ষাই নয়। রাজনীতি শেষ করে দিচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি সবটাতেই দলবা
জির চূড়ান্ত। ফলে লাগাতার অশান্তিতে লেখাপড়া লাটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাহীনদের দাপট। বেশির ভাগই সনদ বিক্রির দোকান যেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ধুঁকছে সেশনজটে। শিক্ষার মান তলানিতে। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় বিশৃঙ্খলা চরমে। আর এসব দেখার দায়িত্ব যাদের, সেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ।
উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক আন্দোলনের মুখে গত ২৩ এপ্রিল দুই মাসের ছুটিতে যান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়া। ২২ জুন ফিরেই তিনি নতুন প্রক্টরিয়াল কমিটি অনুমোদন করেন। ওই দিন বিকেল পর্যন্ত তাঁকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষকরা। ২৩ জুন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও উপাচার্য ভবনে তালা ঝোলানো হয়। আন্দোলনরত 'মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ'-এর সদস্যরা পরের দুই দিন উপাচার্য ভবনের সামনে ব্যানার টানিয়ে বসে থাকেন। ছাত্রছাত্রীরাও এ নিয়ে দুই ভাগ। ওই চার দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বলে কিছু ছিল না।
আন্দোলনরত শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক সৈয়দ সামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'উপাচার্য কথা দিয়েছিলেন দুই মাসের ছুটি কাটিয়ে এসেই পদত্যাগ করবেন। কিন্তু তিনি সে পথে যাননি। উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এর মধ্যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায় তাঁকেই নিতে হবে।' তবে উপাচার্য আমিনুল হক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা হলেও চূড়ান্তভাবে তিনি কিছু বলেননি।
গত ২৩ জুন থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল শিক্ষার্থী টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে আন্দোলন করে। তারা ওই দিন উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে ভিসি কার্যালয়ে জিম্মি করে। পরদিন শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা অবরুদ্ধ এবং রাতে একাডেমিক ভবন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ২৫ জুন দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে চাকরিপ্রত্যাশী ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক নেতাদের দাবির মুখে ইবি প্রশাসন জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রশাসন ভবন, ভিসি অফিস ও অন্যান্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় গত ২২ জুন থেকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ২৪ জুন একটা সমঝোতা হলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি।
গত এপ্রিলে দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে নিহত হয় দুই ছাত্র। মে মাসে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণ যায় আরেক ছাত্রের। এভাবে প্রতি মাসেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। রাজনীতিতে পিছিয়ে নেই শিক্ষকরাও। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫তম সিন্ডিকেট সভায় পদোন্নতি ও শিক্ষাছুটি-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন না হওয়ায় সম্প্রতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল শিক্ষক সমিতি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, শেরে বাংলা কৃষিসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আন্দোলনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন উপাচার্যরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় মূলত রাজনৈতিক পরিচয় আর স্বজনপ্রীতির ওপর ভিত্তি করে। এ কারণে শিক্ষকরাও লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিতেই মনোযোগী বেশি। আর শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের পক্ষে নয়তো বিপক্ষে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক অসন্তোষ চরমে। তাঁদের নানা দাবি-দাওয়ার কারণে প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হয়। একান্তই প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে শিক্ষক অসন্তোষের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম লাটে ওঠে।
জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খানের কণ্ঠেও শোনা গেল হতাশার কথা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপরের দিকে যিনি থাকেন, তাঁর মানই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মান বাড়বে কিভাবে? শিক্ষকরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকেন কনসালট্যান্সি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে। আর শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতি তো নিয়মে পরিণত হয়েছে। গ্রন্থাগারে যে বই আছে, তা শিক্ষক-ছাত্ররা ধরেও দেখেন না। মঞ্জুরি কমিশন এসব ব্যাপারে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। আমরা শুধু সুপারিশ করি। এখন কেউ যদি তা না শোনে, তাহলে কী করার আছে?'
আন্দোলন তেমন একটা না থাকলেও অনিয়মে অনেক এগিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গাজীপুরের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আলতাব হোসেন ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন গত বছরের মে মাস থেকে। বিষয়টি নজরে এলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তর তদন্তে নেমে দেখতে পায়, তিনি আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার অনুমতি নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ডিগ্রি বিক্রি করেছে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে দেড় থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত। আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এক হাজার পিএইচডি ডিগ্রি বিক্রি করেছে। এই পাঁচ হাজার ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ইউজিসির কাছেও এখন ৫০টি ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির প্রমাণ রয়েছে। শুধু তাই নয়, পড়ালেখা না করিয়েই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও দিচ্ছে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির চতুর্থ সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের কাছ থেকে এক হাজার ৫৩১ জনকে সনদ প্রদানের অনুমতি নেওয়া হয়। কিন্তু এর বাইরেও অতিরিক্ত ছয় হাজার ২০ জনকে অননুমোদিতভাবে ডিগ্রি দেওয়া হয়। পঞ্চম সমাবর্তনে চার হাজার ৭০৯ জনের স্থলে ১০ হাজার ২২৬ জনকে সনদ প্রদানের প্রস্তুতি নেওয়া হলে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ওই অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ২০০৯ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির আর কোনো সমাবর্তন হয়নি। অথচ এ ছয় বছরে আরো প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেছেন। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ও গত ২০ বছরে শতাধিক ক্যাম্পাসের মাধ্যমে বিক্রি করেছে হাজার হাজার ডিগ্রি। গত বছরও টিআইবি এক প্রতিবেদনে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদ বিক্রির অভিযোগ তোলে।
নিয়ম আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা সার্বক্ষণিক শিক্ষকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না। অথচ টিআইবি গত বছর এক প্রতিবেদনে বলেছে, কাগজে-কলমে শিক্ষকদের কোটা পূরণ দেখানো হলেও বাস্তবে তা নেই। পূর্ণকালীন শিক্ষকের চেয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। শুধু শিক্ষকদের সিভি সংরক্ষিত রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নত দেখাতে ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকদের না জানিয়েও তাঁদের সিভি ব্যবহার করা হয়। নিজের দক্ষতা প্রমাণে শিক্ষকরাও ভুয়া পিএইডি ডিগ্রি ব্যবহার করেন। আবার অযোগ্যদেরও শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। কম যোগ্যকে বিভাগীয় প্রধান করারও প্রমাণ আছে। ফলে মানসম্মত শিক্ষা সোনার হরিণ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আবুল কাশেম হায়দার বলেন, 'বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক আসলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছেন। আইনে অলাভজনক থাকায় তাঁরা সরাসরি টাকা নিতে না পারলেও ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পারিবারিক সদস্য নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে লাগামছাড়া ফি বাড়াচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি আরো দায়িত্বশীল হলে এ স্বেচ্ছাচারিতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।'
উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২০ লাখই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তহীন সমস্যা। চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ হতে পেড়িয়ে যায় সাড়ে ছয় বছর। ডিগ্রি ও মাস্টার্সেও লেগে আছে দীর্ঘ সেশনজট। ইউজিসিই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তাদের সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত দুই হাজারেরও বেশি কলেজ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষে একটি দুরূহ কাজ। সেশনজট উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অধিভুক্ত বেশির ভাগ কলেজে একাদশ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এতে সমস্যা হচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কারিকুলাম প্রণয়ন এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। তবে শিক্ষক নিয়োগ ও বদলিতে এর কোনো ভূমিকা নেই। এর ফলে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণহারা।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, 'জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্সে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণি পাচ্ছে। অথচ পাঠ্যসূচির বাইরে তারা কিছুই জানে না। এমনও দেখা যায়, ১০ থেকে ১৫টা প্রশ্ন পড়লেই তার মধ্যে পাঁচটি প্রশ্ন কমন পড়ছে। তাই পুরো বই পড়ার তাগিদ থাকে না তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া কি এভাবে হয়? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগই নতুন। সেখানে নিয়োগ হয় লবিংয়ে। গবেষণা বা পিএইচডি করা শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা কোনো শিক্ষাই নয়।'
ইউজিসির অধীন ২০০৯ সাল থেকে দুই হাজার ৫৪ কোটি টাকায় উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) কাজ শুরু হলেও তা কাজে দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে। তবে হেকেপ প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাঝেমধ্যে সেমিনার করা হয়। আর এই প্রকল্পের টাকা ব্যয়ে পিছিয়ে নেই ইউজিসিও। এর অধিকাংশ কর্মকর্তাই এই প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ঘুরে বেড়ান।
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জায়গা হলেও মূলত মুখস্থবিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ উচ্চশিক্ষা। এমনকি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীও ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। ফলে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বাড়লেও চাকরির বাজারে তারা ঢুকতে পারছে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোতে গবেষণায় বরাদ্দ খুবই কম। ২০১৩-১৪ সালে সর্বাধিক দুই কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা গবেষণায় খরচ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর বুয়েট করেছে ৫৫ লাখ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম নয় লাখ টাকা করে। সবচেয়ে কম খরচ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যান্য বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশেই গবেষণায় ব্যয় দুই-চার লাখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টিতে গবেষণায় এক টাকাও খরচ করেনি। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি এবং টেক্সটাইলভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই আটটি। ৬৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২টির কোনো গবেষণা প্রকল্প নেই। ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বাবদ কোনো বরাদ্দই নেই।
জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহানাওয়াজ বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ঢোকায় মেধাবীদের কদর নেই। যারা রাজনীতি করে শিক্ষক হন, তাঁরা ক্লাসে না গিয়ে রাজনীতির পেছনে ঘোরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব মেধাবীদের হাতে না এলে মান বাড়ার সুযোগ নেই। আর বিশ্ববিদ্যালয় তো স্কুল-কলেজ নয়। এটা গবেষণার জায়গা। অথচ আমাদের এখাতে তেমন কোনো বরাদ্দই নেই। ফলে উচ্চশিক্ষা চলছে গবেষণাহীন।'
Source:http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2015/07/02/240292

Wednesday, July 1, 2015

পড়ালেখায়ও কর দিতে হবে!

আলী ইমাম মজুমদার
অলংকরণ: মাসুক হেলালরাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অর্থ আবশ্যক। এ অর্থের প্রধান উৎস জনগণের দেওয়া কর। সেই কর কোথা থেকে আসবে আর ব্যয় হবে কোথায়, তা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদকে দিয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, আয় হবে অধিকতর সক্ষমদের কাছ থে
কে। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখা এবং এর কল্যাণধর্মী চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের চাহিদা অনুযায়ী হবে ব্যয়। সংবিধানের প্রস্তাবনায়ও ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য’ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বিবেচনা করা যায় যে শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রের সহায়তা থাকবে সর্বতোমুখী। এর জন্য ব্যয় করবে সামর্থ্য অনুসারে। অবশ্য গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যয়ভার আমাদের মতো দেশের সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এই ব্যয়ের অংশীদার হতে হবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকেও। তা–ই হয়ে চলছে দীর্ঘকাল যাবৎ। প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলেও এ ব্যবস্থাই আমাদের সমাজে ক্রমান্বয়ে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে অবদান রাখছে। এই ব্যয়কে একটি সামাজিক বিনিয়োগ বলেই বিবেচনা করা হয়। তাই এ খাতে করারোপ করে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের মূলনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, ৪ জুন ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আয়ের ওপর ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। পরে সাড়ে ৭ শতাংশ বহাল রাখা হয়। তাঁর মতে, শিক্ষাসহ অন্যান্য সামাজিক খাতে অধিকতর বিনিয়োগের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর সংগ্রহ করা যৌক্তিক। আলোচনা প্রাসঙ্গিক যে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর করারোপ করা হলেও তা আদায় করা হবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বের ধরনে বিভিন্ন দল থাকলেও মূলত কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই। সে কারণে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সংসদে কেউ সোচ্চার হননি। তবে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এর সমর্থক কারও মতে, সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন। তঁাদের আরেকটু বেশি ব্যয় করা অসংগত হবে না। তবে প্রায় বিনা মূল্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল কলেজের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আসন থাকলে এত অধিক টাকা ব্যয় করে খুব কমসংখ্যকই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পথে চলতেন। কেউবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেশন জট, মন্দ ছাত্র রাজনীতিসহ কোনো কোনো কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। তাঁদের সেই যাওয়াও যৌক্তিক। এর জন্য তাঁরা দিচ্ছেন চড়া মাশুল। আবার কর দেবেন কেন এবং কী যুক্তিতে?
যতটুকু জানা যায়, এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩টি, শিক্ষার্থী আছেন সাড়ে চার লাখ। তেমনি ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আছেন ২০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তো ছিল রাষ্ট্রের। তা করা হলো না। বরং উল্টো কর বসিয়ে আরও ব্যয়বহুল করে পথের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে উচ্চ–মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাশাপাশি নিম্ন–মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও প্রচুর ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। সরকারের কোনো ব্যয় ছাড়াই তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এতেও বাধা! এর নৈতিক দিকটি কোথায় তা বোঝা দুর্বোধ্য। পাশাপাশি এই স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রায় বিনা মূল্যে পড়ছেন। তা পড়ুক। সরকারের সামর্থ্য থাকলে সেখানে আরও ব্যয় করা উচিত। সে দাবিও সবাই করেন। তবে যাঁরা সেগুলোতে পড়তে পারেন না বা পড়েন না কোনো না কোনো কারণে, তাঁদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ কেন?
বলা হয়, বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিক হারে ছাত্র-বেতনসহ অন্যান্য ফি নিচ্ছে। অভিযোগ অনেকাংশে সত্য হতে পারে। আর তা ঠেকানোর জন্য তো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকার রয়েছে। তা না করে এ ধরনের করারোপ তো ছাত্রছাত্রীদের বোঝা আরও বাড়াল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুটি কয়েক উঁচু মানসম্পন্ন। তবে বেশির ভাগই নয়। আর সেসব প্রতিষ্ঠানে কিন্তু খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরাই। আর মানের এই দুর্বলতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো ভূমিকাই তো লক্ষণীয় হয় না। সেদিন শিক্ষাসচিব রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে মন্তব্য করলেন—একটি ভালো স্কুলের সুযোগ-সুবিধাও এগুলোতে নেই। তিনি সাহস করে সত্য কথা বলেছেন। তবে এদের পরিচালনার অনুমতি কারা দিল? আর সময়ান্তরে নবায়ন করছে কারা? নিজ ক্যাম্পাসে যাওয়ার একটি সময়সীমা একবার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কিছু হয়নি। কিছুই হয়নি, যারা আদেশকে মানল না তাদের। সময়ান্তরে পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর দায়িত্বও নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে। তাদের জনবল বা অন্য কোনো সক্ষমতার অভাব থাকলে তা দূর করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। জানা যায়, আরও শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন বিবেচনাধীন আছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে এতৎসংক্রান্ত দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়ের। নামকাওয়াস্তে রোগী নিয়ে একটি হাসপাতাল জরাজীর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি নিয়েই শুরু করছে চিকিৎসা শিক্ষার ন্যায় জটিল কাজ। অনুমোদন ও সময়ান্তরে নবায়নও হয়। ডিগ্রি নিয়ে বের হন শিক্ষার্থীরা। আর এ দোষ তো তাঁদের নয়। যাদের এ অব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের। সেই অক্ষমতার মাশুল দেবেন ছাত্রছাত্রীরা, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ঠিক তেমনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোও। এখানে ব্যয়ের অতিরিক্ত আয় উদ্যোক্তা, ট্রাস্টি বা বোর্ড সদস্যরা কেউ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন না। তা ব্যয় করতে হয় ভবন নির্মাণ, গবেষণাগার ও পাঠাগার সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের বর্ধিত বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া ইত্যাদি কাজে। কেউ তা না করে বাঁকা পথে নিতে চাইলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা হলে এমনটা হবে না। তবে প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি সরকারের সময়ে কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে তাদের সমর্থিত ব্যক্তিদেরই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর পরিচালনা পর্ষদের হয় কিছু চেহারা বদল। এমনকি বদলে যায় প্রতিষ্ঠানটির নাম। এই সুবিধার বিষয় মাথায় রেখে এমন নাম বদল বারবার হচ্ছে, এমনটাই দেখা যায়। তাদের কার্যক্রমের ওপর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর কর বসিয়ে কিছু টাকা আয় হলেও এগুলোর মানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই। এমনিতেই আমাদের দেশে শিক্ষায় বিনিয়োগ কম বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মধ্যেও যেটুকু বেসরকারি বিনিয়োগ আসছে, তার ওপর কর বসানোয় তা–ও নিরুৎসাহিত হবে।
কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ অযৌক্তিক। এটা সংবিধান প্রদত্ত আমাদের শিক্ষা লাভের অধিকারের পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও সরকার তা করে চলেছে। কিছুকাল আগে থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীরা সাড়ে ৭ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর দিয়ে যাচ্ছে সরকারকে। তবে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সাড়ে ৪ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব, প্রতিবাদের মুখে সরকার তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এ বছর বর্ধিত হারেই কর আরোগিত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশে প্রায় সব ক্ষেত্রেই করের ছড়াছড়ি। সেখানেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়ে গেছে করের আওতার বাইরে।
বরং তারা সেবামূলক সংস্থাগুলো থেকে কিছু ছাড় পায়। দিতে হয় না পৌর কর। এটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার যে সরকারের এসব শিক্ষার্থীর জন্য যে অর্থ ব্যয় করার কথা ছিল, তা করতে হচ্ছে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সেই দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে তো তাঁরা আশা করতেই পারেন সরকারি সহায়তা। করের বোঝা নয়। পড়ালেখা করতেও যদি কর দিতে হয়, তা সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক অঙ্গীকারের পরিপন্থীই হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

Tuesday, June 30, 2015

দেশের স্বপ্নে বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু ও অষ্টম বেতন স্কেল

ফিদা হাসান
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ‘এসোসিয়েশন অফ কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি’র অর্থায়নে সম্প্রতি পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষনায় সারকথা হিসাবে বলা হয়েছে, ‘সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাই বৃহদাকারে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় ছিলো।’ উন্নত বিশ্ব এমন কি উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য।

ইতিহাস বলে, তেরশো শতকের দিকে যুক্তরাজ্যর শাসকেরা যখন কেমব্রিজের মত বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান করেছিলো মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার শাসকেরা তখন নির্মান করতো উপাসনালয়। সময়ের পরিক্রমায় এখন সেই কেমব্রিজ হয়েছে আধুনিক মানুষের তীর্থস্থান।
দেশ হিসাবে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত নবীন তাই বিভিন্ন অসুবিধার পাশাপাশি সুবিধাও কিন্তু অনেক, আমরা চাইলে অন্যের অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ করতে পারি যেটা সবসময় নবীনদের জন্য একটা এডভান্টেজ। কিন্তু দুর্ভাগা এই দেশ বলতেই হয়, তা না হলে এই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে যে বোকামিটা আমরা করছি তার জন্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়ী থাকতে হবে নিঃসন্দেহে।
উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেন্দ্র করেই ঘটনার আবর্ত তৈরি করে। এই যেমন, বিভিন্ন দেশের রেওয়াজ আছে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়ে প্রথম বক্তৃতা তিনি দেন কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিংবা কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান অন্য দেশে পরিদর্শনে গেলে সেই দেশের কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন। এমনই ঘটনার ধারাবাহিকতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছে, ( যদিও এই বক্তৃতার ব্যবস্থা শুধুমাত্র জনাব নরেন্দ্র মোদীর অভিপ্রায়ে হয়েছে তা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রশাসনের উদাসীনতা দেখে সহজে অনুমেয়।) কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না, বরং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের ক্ষতিকর উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই হতে পারতো আমাদের স্বপ্ন গড়ার কারখানা। কেননা এটাই সত্য, এই বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গন অভ্যুথান, ৭১-এর স্বাধীনতা, ৯০ এর স্বৈরাচার পতন কিংবা হালের ২০০৮ এর অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সবই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু এবং এর ঘটনা প্রবাহ ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক। যুদ্ধ বিগ্রহ শেষে স্বাধীনতা উত্তর সত্যিকারের দেশ গড়ায় তাই বিশ্ববিদ্যালয়ই পারে প্রধান ভূমিকা রাখতে। আমাদের শুরুটাও কিন্তু ঠিক তেমনটাই ছিলো। কিন্তু ধীরে ধীর সব কিছু বুর্জয়াদের অধিগ্রহনে চলে যাচ্ছে, যা ভয়াবহ কিছুর নির্দেশক।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শুরুর ঘটনা বলতে গেলে বলতে হয়, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বাধীনতা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাষনের আইন জাতীয় সংসদের পাশ করান যেটা ৭৩-এর অধ্যাদেশ নামে বহুল পরিচিত। কথিত আছে ড. কামাল হোসেন তখন বিরোধীতা করেছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহিতার ভিতরে আনতে হবে। প্রতিউত্তরে বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় ধমকে বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাদের বিবেকের কাছে জবাব দিবে, তাদের আর কোন দায়বদ্ধতার প্রয়োজন নেই’।
যদিও উপরিউক্ত বিষয়টি আমার শোনা কথা, আমি চাক্ষুষ ঘটনাপ্রবাহ দেখি নি। তবে আমি যেটা দেখেছি তা থেকে ঘটনার সত্যতা নিরুপন করতেও কিন্তু বেগ পেতে হয় না।
একটু লক্ষ করে দেখুন, বঙ্গবন্ধু তার দুই কন্যাকে বিবাহ দিয়েছেন কাদের সাথে (আমাদের সমাজে তখন বিবাহ দেওয়ার রীতি যেমন ছিলো বিশেষত মেয়ের ক্ষেত্রে)। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তুলে দিয়েছিলেন একজন পরমানু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার হাতে । আর তার ছোট মেয়ে শেখ রেহানাকে তিনি বিবাহ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকীর সাথে। গাড়িতে ফ্লাগ উড়িয়ে চলা মন্ত্রী, আমলা কিংবা বড় ব্যবসায়ীরা যে তখন ছিলো না, ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে ভিশন বা দর্শন। তিনি ছিলেন তার জন্ম দেওয়া দেশের ভিশিয়নারী, স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই তার মেয়ে জামাই পছন্দের মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে দেশকে নিয়ে তার ভিশন ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
অথচ সময়ের কি নির্মম পরিহাস, এখন আমরা হরহামেশাই দেখতে পাই ইচ্ছামতো এটা সেটাকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে অনলাইন পত্রিকায় দেখেছিলাম কোন এক মন্ত্রী নাকি বাংলাদেশে সেলুলার ফোনের তৃতীয় প্রজন্মের ব্যবহারকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিলো বলে আখ্যায়িত করেছে। তথ্যের সত্যতা জানি না, তবে আশেপাশের পরিস্থিতি দেখে মিথ্যা বলে একবাক্যে উড়িয়েও দিতে পারি না। এখানে উল্লেখ্য যে, সেলুলার ফোনের প্রথম প্রজন্মেরই সৃষ্টি হয় বঙ্গবন্ধু প্রয়াত হওয়ারও ৪ বছর পর (১৯৭৯-এ)। একইভাবে রাস্তাঘাটে বিভিন্ন পোস্টার ফেস্টুন দেখতে পাই, পাড়ার বখাটে ছেলেটার ছবি সেই সাথে তার মনগড়া কোন কথা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখেছিলাম, জনাব ওবায়দুল কাদের বলছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীর ছবি দেখে বিব্রতবোধ করেন। যা আমার উপরোক্ত অবজারভেশনকেই নির্দেশিত করে। এভাবে সব সুযোগ সন্ধানীরা দেশটাকে বিপথগামী করেছে, এখনও করে যাচ্ছে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনভাবে কিছু লোক সত্য সন্ধান করুক, সত্য কথা বলুক তা সুযোগ সন্ধানীরা কখনোই চায় নি। সেই পরিক্রমায় আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আঘাত করে কন্ঠ রোধ করতে চাইছে তারা।
কথিত আছে, আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি মাহাথির মহাম্মদ তার দেশ সেবায় আসার পর পর-ই নিজে নিজের ব্যক্তিগত ফোন দিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষনারত মেধাবী মালয়শিয়ানদের দেশে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করতো। এরকম একজন মালয়শিয়ানের একটি কলাম পড়েছিলাম, তিনি লিখেছিলেন, গভীর রাতে তিনি একটা ফোন পান, ফোনের ওপাশ থেকে পরিচয় আসে তিনি তার দেশের প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মহাম্মাদ, এরপর প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশে ফিরে যাবার অনুরোধ করেন। তিনি লিখেছিলেন, মাহাথির এই কাজটি এতটাই আবেগ দিয়ে করতো যে তিনি ভুলে যেতেন যাকে ফোন দিচ্ছেন সেখানে এখন রাত না দিন। সেই মালয় লোকটি ফোন পাবার এক মাসের ভিতর সব গুছিয়ে নিজের দেশে ফিরে যান। আর এমন অসংখ্য ফোন আর মেধাবীদের ফিরে যাওয়াই আজ আধুনিক মালয়শিয়া সৃষ্টির রহস্য যা বোঝার জন্য বেগ পেতে হয় না। মাহাথিরের ছিলো ভিশন বা স্বপ্ন, আর তার বাস্তবায়নের কারিগর ছিলো মেধাবীরা।
দুর্ভাগা এই জাতি, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও মনে হচ্ছে একজন স্বপ্নদৃষ্টা অভিভাবকের অভাবে আমরা পথ হারা, তাই নিজের দেশ ছেড়ে উত্তাল সমুদ্রে ডিঙ্গি নৌকা করে সেই মাহাথিরের দেশে যেতে প্রান দেই, কিন্তু আমাদের জীবন এমন না হলেও পারতো, এক শেখ মুজিব কিন্তু ৪৪ বছর আগে সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন যা মাহাথির তার দেশে করেছিলেন বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ বড়ই অভাগা, যখনই একজন সপ্নচারী এসেছে আমরা তাকে সরিয়ে দিয়েছি। কাউকেই হাল ধরতে দেইনি।
অষ্টম বেতন স্কেল এক সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার ফল, শুধুমাত্র এক শ্রেনীর লোক তাদের হীনমানসিকতা চরিতার্থ করতে এই পরিকল্পনার আশ্রয় নিয়েছে যা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য অন্ধকার কিছু। এটা পরিবর্তন না করে এভাবে রেখে দিলে মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আসবে না, সেই সাথে স্বাধীন মানুষ তৈরি হবে না যারা জাতি্কে সংকটে পথ দেখাবে। এটা হবে ১৪ই ডিসেম্বরের মত আরো একবার বুদ্ধিজীবি হত্যা, এবং সৃষ্টির জরায়ুকে চিরতরে নষ্ট করে দেওয়া। যা কাম্য নয়, কোনভাবেই নয়।
-ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে
লেখক: সহকারি অধ্যাপক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
Source: http://goo.gl/BrCH8r

Saturday, June 27, 2015

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা

Kamrul Hassan

একটা দেশে কতজন ছাত্র মাস্টার্স করছে আর তার কত অংশ পিএইচডিতে এনরোল হচ্ছে সেটাও শিক্ষার মানের একটা লিটমাস টেস্ট বা ধারণা সুচক হতে পারে। বাংলাদেশে এত এত বিশ্ববিদ্যালয় এত এত ছাত্র কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্র সত্বেও পিএইচডি ছাত্র প্রায় নেই বললেই চলে। আর পোস্ট-ডক নামে কিছু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে বলেই মনে হয় না। কেউ এটার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে বলে মনে হয় না। পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক ব্যেতিত উচ্চ শিক্ষা এবং গবেষণা ভাবাই যায় না। আমার বয়সের, আমার মত একজন অধ্যাপকের থাকা উচিত ছিল কমপক্ষে একজন পোস্ট-ডক এবং দুইজন পিএইচডি ছাত্র। এখন একজন ছাত্র কি পিএইচডি করবে বাবার পয়সায়? না। তারজন্য সরকারকে একটা ভালো মানের ফেলোশিপ দিতে হবে। ন্যুনতম ৩০০০০ টাকা যেন তাকে সংসার চালানোর চিন্তা করতে না হয়। বাহিরের দেশে যেমন ভারতের একজন পিএইচডি ছাত্র ফেলোশিপ পায় ৪৫০০০ টাকা। আমি যদি ভারত থেকেও এক বা দুইজন পোস্ট-ডক পেতাম তাহলে বাংলাদেশ বসেই ভালো গবেষণা করা যেত।


আমাদের দিন একজন পোস্ট-ডক আর দুইজন পিএইচডি ছাত্র তারপর দেখুন এই দেশে ভালো মানের গবেষণা হয় কিনা। পোস্ট-ডক্টরাল position দিলে ভারত থেকে অনেক ভালো মানের গবেষক পাব। তাদের লাভ যে পোস্ট-ডক্টরাল এক্সপেরিয়েন্স দেখিয়ে অন্যত্র চাকুরী পাবে আর আমাদের লাভ এখানে গবেষনার একটা এনভায়রনমেন্ট তৈরী হবে। সারা পৃথিবীতে এভাবেই গবেষনা হয়। আমরা আন্তর্জাতিক ট্রেন্ডস ফলো করব না, তো আন্তর্জাতিক গবেষণা হবে কিভাবে? আমাদের আছে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় যার ৯০% বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচডি ছাত্র নেই। ১০% বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আছে তাও নামে মাত্র। আর পোস্ট-ডক্টরাল position? সন্দেহ হয়. যারা ওগুলো চালায় তারা এ সম্মন্ধে কখনো কিছু শুনেছি কিনা। আমাদের এখানে পিএইচডি প্রাপ্ত শিক্ষক বা গবেষকের অভাব নেই কিন্তু পোস্ট-ডক্টরাল experience আছে এরকম শিক্ষক বা গবেষকের সংখ্যা আমার ধারণা খুবই কম। এগুলোও একটা দেশের শিক্ষা ও গবেষনার একটা ধারণা সূচক হতে পারে।

কামরুল হাসান
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।