তারেক শামসুর রেহমান
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই পে স্কেলে খুশি হননি। তাদের যুক্তি, সিনিয়র শিক্ষকরা এখন ‘সিলেকশন গ্রেড’ বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তারা সচিব পদমর্যাদার গ্রেড ১-এর সুযোগ-সুবিধা, বেতনও পাবেন না। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সচিবরা নিজেদের সুবিধার জন্য যদি সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে শিক্ষকদের জন্য সিনিয়র অধ্যাপকের পদ নয় কেন? দ্বিতীয়ত, বেতন স্কেলে (অধ্যাপকের সিনিয়র অধ্যাপক নন) গ্রেড এখন ৩-এ। অর্থাৎ তার বেতন শুরু হবে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে। রাষ্ট্রের ‘ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি’তে তাদের অবস্থান অনেক নিচে, যুগ্ম সচিবেরও নিচে। এটা কি শোভন? একজন অধ্যাপককে কি যুগ্ম সচিবের সঙ্গে তুলনা করা যায়? তাহলে একজন উপাচার্যের পদমর্যাদা কী? তিনি যদি ‘সিলেকশন গ্রেড’ভুক্ত প্রফেসর না হয়ে থাকেন (৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনও ‘সিলেকশন গ্রেড’ভুক্ত প্রফেসর নন), তাহলে তার পদমর্যাদা কী হবে? ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কি সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে তার ‘ছাত্রতুল্য’ যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে বসবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কি তাই করবেন? সচিবরাই এ কাজটি করলেন। তারা নিজেদের শিক্ষকদের চেয়েও উপরে রাখলেন। অথচ অনেক সচিবের ‘ভুয়া ডিগ্রি’ আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করেছেন এ সংখ্যাও কম নয়। এমনকি অনেকে ‘ভুয়া পিএইচডি’ ডিগ্রি ব্যবহার করেন। অনেক সিনিয়র সচিবের নামের আগে ইদানীং দেখি তারা ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি ব্যবহার করেন। কীভাবে পেলেন এই ডিগ্রি? কোথায় করলেন? এখন তারাই যদি নিজেদের সিনিয়র অধ্যাপকদের উপরে রাখেন তা দুঃখজনক। সচিব আর আমলা কখনো এক হতে পারে না। তাদের কাজের ধরন আলাদা। একজন সচিব যে শুধু এখন বেশি বেতন পাবেন, তাই নয়। তাদের সুযোগ-সুবিধা কয়েক লাখ টাকার সমান। যেমন একজন সচিব সার্বক্ষণিক তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেন। তার স্ত্রী রাষ্ট্রের কর্মচারী নন। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি কোনো অবদানও রাখেন না। অথচ তিনি সার্বক্ষণিক একটি গাড়ি ব্যবহার করেন! বিভিন্ন প্রকল্প থেকে গাড়ি নিয়ে তা ব্যবহার করেন তার সন্তানরা। যে ‘বাংলোবাড়ি’তে তিনি থাকেন, তার বাসাভাড়া হিসাব করলে মাসপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। তাদের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল খুব সম্ভবত ‘ফ্রি’। গাড়ির অকটেন, গ্যাস ‘ফ্রি’। হিসাব করুন এই রাষ্ট্র একজন সচিবের জন্য কী খরচ করে? সেই তুলনায় একজন শিক্ষক কী পান? ওই বেতনই তার একমাত্র ভরসা। আমি কয়েক ডজন অধ্যাপককে চিনি, যাদের গাড়ি নেই, বাড়ি নেই, চলেন রিকশাতে আর লক্কর মার্কা বাসে। রাষ্ট্র তাদের জন্য ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করে দেয়নি। কিংবা সরকারি ব্যাংক থেকে কম সুদে বাড়ি, ফ্যাট বা গাড়ি ক্রয় করার ব্যবস্থা করে দেয়নি! অথচ তারাই তথাকথিত ‘সমাজ গড়ার কারিগর’। তারাই সচিবদের ‘জন্ম’ দিয়েছেন, তৈরি করেছেন, শিক্ষিত করেছেন।
আর এই সচিব কমিটিই তাদের অমর্যাদা করল। অর্থমন্ত্রী যে ‘ভাষায়’ শিক্ষকদের সমালোচনা করেছেন তা ছিল অনাকাক্সিক্ষত। একজন অবিবেচক মানুষ তিনি। তিনি যে মনে-প্রাণে একজন আমলা, সেটাই তিনি প্রমাণ করলেন! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন! তার মতো একজন ‘সিনিয়র সিটিজেনের’ কাছ থেকে আমরা এটা আশা করিনি। তার অনাকাক্সিক্ষত বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারকে একটা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। তিনি অবশ্য তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কিন্তু ‘ক্ষতি’ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এটা সত্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ‘সবকিছুর ঊর্ধ্বে’ নন। এটা আমি মনেও করি না। যাদের শিক্ষক হওয়ার কথা ছিল না, তারা ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ শিক্ষক হয়েছেনÑ এটা অস্বীকার করা যাবে না। যে যে বিভাগের ‘ছাত্র’ নন, তাকে সেই বিভাগে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতির নীতি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক তা বলা যাবে না। এ ব্যাপারে অনেক সরকারি আমলার মধ্যে আমি এক ধরনের ‘ক্ষোভ’ দেখেছি। আমার ছাত্র যারা আমলা হয়েছে, তাদেরও দেখেছি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে!
এখন অর্থমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন বটে কিন্তু সবকিছু ‘শেষ’ হয়ে গেছে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একটি মন্ত্রিপরিষদ কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, যারা শিক্ষকদের দাবি-দাওয়াগুলো খতিয়ে দেখবেন। এখানেও একটা ভুল হয়েছে। উচিত ছিল শিক্ষকদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা। কমিটিতে সচিবরা থাকলে তারা বিরোধিতা করবেন। তবে মন্ত্রিপরিষদের বিবেচনার জন্য কিছু প্রস্তাব রাখতে চাই। ১. বর্তমান পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষকদের (স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) জন্য আলাদা বেতন কাঠামো তৈরি করা হোক। কমিটি সময় দিক ও সবার মতামত নিক এবং সব শ্রেণির প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হোক এই কমিটিতে। ২. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করা হোক। এখন অনুমতি নিয়ে, বিনা অনুমতিতে, প্রাপ্ত সম্মানীর ১০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দেওয়ার শর্তে (যা কেউই দেন না) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাস নেন, এটা বন্ধ হোক। ৩. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হোক। তাদের কোনো সুদ ছাড়াই গাড়ি, ফ্যাট কেনার ব্যবস্থা করা হোক। মূল বেতনের পাশে অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার টাকা দেওয়া হোক ‘বিশেষ ভাতা’ হিসেবে, যাতে তারা নিরুৎসাহিত হন অন্যত্র কাস নিতে। ৪. সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আইনের আওতায় আনা হোক। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই পদোন্নতির নীতিমালা হোক। ৫. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে পিএসসির মতো আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হোক। ৬. তরুণ শিক্ষকদের পিএইচডি করতে ‘ফান্ড’-এর ব্যবস্থা করা হোক এবং পিএইচডি ছাড়া অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিষিদ্ধ হোক। ৭. অধ্যাপক পদে দুটি গ্রেড করা হোকÑ গ্রেড-১ ও গ্রেড-২। ‘সিলেকশন গ্রেড’ অথবা ১০ বছর অধ্যাপক পদে থাকা অধ্যাপকদের গ্রেড ১-এ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হোক। তবে শর্ত থাকে, তাকে একটি গবেষণামূলক বই লিখতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদের গবেষণামূলক পাঠ্যবই প্রণয়নে উৎসাহিত করা হোক। ৮. পাস করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে (প্রভাষক) নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা হোক। এর পরিবর্তে তাকে ন্যূনতম এক বছর একজন সিনিয়র শিক্ষকের অধীনে ‘গবেষণা’ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগ দেওয়া হোক।
মোট কথা, ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন (যা চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে) পরিবর্তন করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি আইন করা হোক। শিক্ষকদের ‘দায়িত্ব ও কর্তব্য’ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক। ‘ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি’তে শিক্ষকদের অবস্থান তুলে দেওয়া হোক। এটা থাকুক শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এর কোনো দরকার নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখনো আন্দোলনে আছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হোক। সরকারপ্রধানও তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
0 comments:
Post a Comment